সুভা গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর – ৯ম ও ১০ম শ্রেণির বাংলা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সুভা’ গল্পে ভাষা শুধু কথার মাধ্যমে প্রকাশ পায় না, অনুভূতিরও একটা নিজস্ব ভাষা আছে। বোবা সুভার জীবনের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ আমাদের দেখিয়েছেন ভালোবাসা, বেদনা, নিঃসঙ্গতা এসব অনুভব করার জন্য কথার চেয়েও হৃদয়ের যোগাযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সুভা বোবা বলে সমাজ তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করে, তাকে অভিশাপ বলে মনে করে এবং তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নিন্দা করে। এটি প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি সমাজের নিষ্ঠুর আচরণকে তুলে ধরে। সুভার মা তাকে নিজের গর্ভের কলঙ্ক মনে করে বিরক্ত হন, কিন্তু বাবা বাণীকণ্ঠ তাকে অন্যদের চেয়ে বেশি স্নেহ করেন।

সুভা গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

সৃজনশীল প্রশ্নঃ ১। [বোর্ড বইয়ের প্রশ্ন]
দুই পুত্রসন্তানের পর কন্যাসন্তান পলাশ বাবুর পরিবারে আনন্দের বন্যা নিয়ে এল। নাম রাখা হলো ‘কল্যাণী’। সকলের চোখের মণি কল্যাণী বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পলাশ বাবু বুঝতে পারলেন, বয়সের তুলনায় কল্যাণীর মানসিক বিকাশ ঘটেনি। কিছু বললে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। কল্যাণীর বিয়ের কথাবার্তা চলছে। পলাশ বাবু কল্যাণীর অবস্থা বরপক্ষকে খুলে বললেন। সব শুনে বরের বাবা সুবোধ বাবু বললেন, ‘পলাশ বাবু কল্যাণীর মতো আমার ছেলেও তো হতে পারত, কাজেই কল্যাণীমাকে ঘরে নিতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’

ক. সুভার গ্রামের নাম কী?

খ. ‘পিতা-মাতার নীরব হৃদয়ভার’- কথাটি দ্বার দ্বারা লেখক কী বোঝাতে চেয়েছেন?

গ. উদ্দীপকের প্রথম অংশের বক্তব্যে কল্যাণী ও সুভার যে বিশেষ দিকটির সঙ্গতি দেখানো হয়েছে, তা ব্যাখ্যা কর

ঘ. ‘কল্যাণী ও সুভা একই পরিস্থিতির শিকার হলেও উভয়ের প্রেক্ষাপট ও পরিণতি ভিন্ন’- বিশ্লেষণ কর।

উত্তরঃ

ক. সুভার গ্রামের নাম চন্ডীপুর।

খ. ‘পিতা-মাতার নীরব হৃদয়ভার’ কথাটি দ্বারা বোঝানো হয়েছে, তারা মুখে কিছু না বললেও মন থেকে খুব কষ্ট পেতেন। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা সব সময় চিন্তিত থাকতেন। বিশেষ করে, সন্তানের কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যার কারণে সমাজে কীভাবে মেনে নেওয়া হবে, তা নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় থাকতেন। সুভার মা মনে করতেন, মেয়ের বোবা হওয়া যেন এক লজ্জার বিষয়। বাবা-মা মনে করতেন, মেয়ের ভবিষ্যৎ কী হবে এটা ভাবতেই তাদের মন ভারী হয়ে যেত। তাই লেখক এখানে বোঝাতে চেয়েছেন, বোবা মেয়েকে নিয়ে বাবা-মার মনের কষ্ট অনেক গভীর ছিল।

গ. উদ্দীপকের প্রথম অংশে কল্যাণীর মানসিক বিকাশের সমস্যা ছিল, তাই সে আশেপাশের মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতে পারত না। তাকে কিছু বললে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকত, অর্থাৎ সে মনের ভাব ভালোভাবে প্রকাশ করতে পারত না। ঠিক একইভাবে সুভাও কথা বলতে পারত না, সে ছিল বোবা। কিন্তু তার চোখে-মুখে, চাহনিতে ছিল অনুভূতির গভীরতা। সুভা যেমন মনের ভাব প্রকৃতি ও পশুপাখির সঙ্গে ভাগ করে নিত, কল্যাণীও নিশ্চয় তার মনের কষ্ট চুপচাপ বহন করত। দুজনেই ছিল নীরব, অব্যক্ত অনুভূতির অধিকারী। তারা বোঝাতে পারত না কী চায় বা কী তাদের কষ্ট। তাই বলা যায়, কল্যাণী ও সুভার মধ্যে একটি মিল আছে তা হলো তাদের প্রকাশের সীমাবদ্ধতা ও অন্তরজগতের নীরবতা। এই দিকটিই গল্প ও উদ্দীপকের মূল সাযুজ্য সৃষ্টি করে।

ঘ. কল্যাণী ও সুভা দুজনেই মানসিক বা শারীরিকভাবে কিছুটা আলাদা ছিলেন, তাই সমাজের চোখে তারা ‘ভিন্ন’ রকম মানুষ। তবে তাদের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও পরিণতি একরকম হয়নি। সুভা বোবা ছিল এবং তার পরিবারের অনেকেই তাকে বোঝেনি বা গুরুত্ব দেয়নি। তার মা লজ্জা পেতেন এবং বিয়ে দেওয়ার চিন্তায় ছিলেন, কিন্তু শেষে সুভাকে নিয়ে শহরে চলে যেতে হয়। অন্যদিকে কল্যাণীর বাবা পলাশ বাবু বুঝেছিলেন মেয়ের সমস্যা আছে, তাই বরপক্ষকে আগে থেকেই তা জানিয়ে দেন। বরপক্ষও দায়িত্বশীলভাবে বলেছে, ‘কল্যাণী আমার ছেলেও তো হতে পারত’ এই কথায় ভালোবাসা ও মানবিকতা প্রকাশ পায়। তাই কল্যাণীর ক্ষেত্রে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দেখা যায়। আর সুভার ক্ষেত্রে বোবা হওয়াটা ছিল এক অন্তরালে থাকা কষ্টের প্রতিচ্ছবি, যেটা কেউ ভালোভাবে বুঝতে পারেনি। সুভা একরকমভাবে নিঃসঙ্গ থেকেছে, কিন্তু কল্যাণী পেয়েছে সহানুভূতির ছোঁয়া। এই কারণে বলা যায়, পরিস্থিতি এক হলেও পরিণতি ও পারিপার্শ্বিকতা ছিল ভিন্ন।

সৃজনশীল প্রশ্নঃ ২। [ঢাকা বোর্ড ২০২৬]
দৃশ্যকল্প-i:
‘এমন যদি হতো
ইচ্ছে হলে আমি হতাম
প্রজাপতির মতো।
নানান রঙ্গের ফুলের ‘পরে
বসে যেতাম চুপটি করে
খেয়াল মতো নানান ফুলের
সুবাস নিতাম কত।’

দৃশ্যকল্প-ii:
মেধাবী শিক্ষার্থী সাজিদ দুর্ঘটনায় একটি পা হারায়। পিতা-মাতা, বন্ধু-বান্ধবসহ সকলের সহযোগিতায় সে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে। এখন সে সমাজে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি।

ক. ‘সুভা’ গল্পের নিতান্ত অকর্মণ্য লোকটি কে?

খ. আমাকে সবাই ভুলিলে বাঁচি সুভা এরূপ মনে করত কেন? বর্ণনা করো।

গ. দৃশ্যকল্প-i এর সাথে ‘সুভা’ গল্পের সাদৃশ্যপূর্ণ দিকটি ব্যাখ্যা করো।

ঘ. “দৃশ্যকল্প-ii এর সাজিদের পিতামাতার মতো যদি সুভার পিতামাতা হতো তাহলে সুভার পরিণতি করুণ হতো না।” মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

উত্তরঃ

ক. ‘সুভা’ গল্পের নিতান্ত অকর্মণ্য লোকটি হলো প্রতাপ।

খ. “আমাকে সবাই ভুলিলে বাঁচি”—সুভা নিজের কষ্ট ও অভিমান থেকে কথাটি মনে মনে ভাবত।

‘সুভা’ গল্পের সুভা ছিল জন্ম থেকেই বাক্‌প্রতিবন্ধী। সে কথা বলতে পারত না বলে অন্যদের মতো স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারত না। প্রতিবেশীরা তার কথা বলতে না পারার বিষয়টি নিয়ে নানা কথা বলত এবং তাকে দেখলেই তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা প্রকাশ করত। এসব কথা শুনে সুভা বারবার নিজের অসহায়ত্বের কথা মনে করত। সুভার নিজের পরিবারও তাকে নিয়ে সব সময় চিন্তিত থাকত। ফলে তার মনে হতো, সবাই যেন তার প্রতিবন্ধকতাকে নিয়েই ভাবছে। এসব কারণে সে মানুষের প্রশ্ন, দুঃখ ও করুণার বদলে সে একা থাকতেই বেশি স্বস্তি পেত। তাই নিজের কষ্ট থেকে সুভা মনে করত, সবাই যদি তাকে ভুলে যায়, তাহলে হয়তো তাকে আর কারও চিন্তা বা কথার মুখোমুখি হতে হবে না।

গ. দৃশ্যকল্প-এ-এর সঙ্গে ‘সুভা’ গল্পের সুভার মনের একটি বিশেষ ইচ্ছার মিল রয়েছে।

গল্পে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুভার মতো বাক্‌প্রতিবন্ধী শিশুর মনের কষ্ট, আশা ও চাওয়াগুলো খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। কথা বলতে না পারায় সুভা অন্যদের কাছ থেকে অবহেলা পেত। তবে গোঁসাইদের ছোট ছেলে প্রতাপ তার নীরব সঙ্গী ছিল। প্রতাপ মাছ ধরতে বসলে সুভা তার পাশে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকত। প্রতাপের কাছে নিজের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য সুভার মনে নানা ইচ্ছা জাগত। সে ভাবত, যদি কোনোভাবে প্রতাপকে অবাক করে দিতে পারত, তাহলে হয়তো প্রতাপ তাকে গুরুত্ব দিত। তাই সে বিধাতার কাছে কোনো অলৌকিক ক্ষমতা পাওয়ার আশা করত।

দৃশ্যকল্প-এ-এর কবিও প্রজাপতি হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। প্রজাপতি হলে তিনি বিভিন্ন রঙের ফুলের ওপর বসতে পারতেন এবং নিজের ইচ্ছামতো ফুলের গন্ধ নিতে পারতেন। এই বিশেষ কিছু হওয়ার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সুভার ইচ্ছার মিল পাওয়া যায়। সুভা বাক্‌প্রতিবন্ধী হওয়ায় তার বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন ও সমবয়সী ছেলেমেয়েদের কাছ থেকেও অবহেলা পেত। তার একমাত্র আপন সঙ্গী ছিল প্রতাপ। প্রতাপ যখন ছিপ দিয়ে মাছ ধরত, সুভা নীরবে তার পাশে বসে থাকত। তখন সুভার মনে হতো, সেও যদি প্রতাপের কোনো কাজে আসতে পারত বা নিজের কোনো বিশেষ ক্ষমতা দেখাতে পারত, তাহলে প্রতাপ তাকে আলাদা করে দেখত। এই কারণেই প্রতাপের মনোযোগ পাওয়ার জন্য সুভা বিধাতার কাছে অলৌকিক শক্তি চাইত। তাই দৃশ্যকল্প-এ-এর কবির বিশেষ কিছু হওয়ার ইচ্ছার সঙ্গে সুভার অলৌকিক ক্ষমতা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার সাদৃশ্য রয়েছে।

ঘ. পিতা-মাতার ভালোবাসা ও সহযোগিতা থাকলে সুভার জীবন এত কষ্টের হতো না। তাই দৃশ্যকল্প-ii-এর সাজিদের পিতা-মাতার মতো যদি সুভার বাবা-মাও তাকে সাহস ও সহায়তা দিতেন, তাহলে তার জীবন এত করুণ পরিণতির দিকে যেত না—মন্তব্যটি যথার্থ।

‘সুভা’ গল্পের সুভা জন্ম থেকেই বাক্‌প্রতিবন্ধী ছিল। কথা বলতে না পারার কারণে সে পরিবার ও সমাজের মানুষের কাছ থেকে অবহেলা পেত। তার সঙ্গে কেউ খেলতে চাইত না। এমনকি তার মা তাকে নিজের জীবনের বোঝা ও গর্ভের কলঙ্ক মনে করতেন। ফলে সুভা নিজের পরিবারেও প্রয়োজনীয় স্নেহ, মায়া ও ভালোবাসা পায়নি। তার বাবা বাণীকণ্ঠও মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতেন।

দৃশ্যকল্প-ii-এর সাজিদ দুর্ঘটনায় একটি পা হারিয়েও ভেঙে পড়েনি। তার বাবা-মা, বন্ধু ও অন্যরা তাকে সাহস দিয়েছে এবং পড়াশোনায় সাহায্য করেছে। সবার সহযোগিতায় সে উচ্চশিক্ষা লাভ করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু সুভা এমন সহযোগিতা পায়নি। বরং তার বাক্‌প্রতিবন্ধকতার জন্য সমাজের মানুষ তাকে নিয়ে নানা কথা বলত। এসব নিন্দার ভয়েই তার বাবা বাণীকণ্ঠ শেষ পর্যন্ত তাকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন।

সুভা যদি সাজিদের মতো পিতা-মাতার কাছ থেকে ভালোবাসা, সাহস ও মানসিক সমর্থন পেত, তাহলে সে নিজেকে এত অসহায় ভাবত না। সে হয়তো নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী সুন্দরভাবে জীবন গড়ে তুলতে পারত। কিন্তু পরিবার ও সমাজের অবহেলার কারণে সে একা হয়ে পড়ে এবং মনে গভীর কষ্ট নিয়ে জীবন কাটায়। তাই সাজিদের জীবনে পিতা-মাতার সহযোগিতা যেমন তাকে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেছে, তেমনি সুভার জীবনে সেই সহযোগিতার অভাবই তার করুণ পরিণতির অন্যতম কারণ। সুতরাং প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।

সৃজনশীল প্রশ্নঃ ৩। [রাজশাহী বোর্ড ২০২৬]
‘নিক ভুজিসিক’ চার হাত-পাবিহীন একজন সফল মানুষ। হাত-পা না থাকা সত্ত্বেও একটুও দমে যাননি তিনি। নিক ভুজিসিক পেশায় একজন প্রেরণা সৃষ্টিকারী বক্তা। কণ্ঠ দিয়েই বিশ্ব জয় করেছেন। প্রেরণা জুগিয়েছেন লক্ষাধিক মানুষের মনে। নিজে সকলের মাঝে প্রেরণা সৃষ্টি করে গেলেও ছোটোবেলায় বেঁচে থাকার প্রেরণাই হারিয়ে ফেলেছিলেন। বিদ্যালয়ে, প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সর্বদা তাকে । লঞ্ছনার শিকার হতে হতো, তার দেহের আকৃতির কারণে। তাই দশ বছর বয়সে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছিলেন।

ক. ‘সুভা’ কোন কথাটি শিশুকাল থেকে বুঝে নিয়েছিল?

খ. প্রতাপের দিকে সুভা কেন মর্মবিদ্ধ হরিণীর মতো তাকিয়ে ছিল?

গ. উদ্দীপকের নিক ভুজিসিকের সঙ্গে ‘সুভা’ গল্পের সুভার বৈসাদৃশ্যের দিকগুলো বর্ণনা করো।

ঘ. উদ্দীপকের নিক ভুজিসিকের মতো ‘সুভা’ গল্পের সুভারও যদি প্রত্যয় থাকত তবে সুভার জীবনটাও অন্যরকম হতে পারত-উদ্দীপক ও ‘সুভা’ গল্পের আলোকে বিশ্লেষণ করো।

উত্তরঃ

ক. সুভা যে বিধাতার অভিশাপরূপে পিতৃগৃহে এসে জন্মগ্রহণ করেছে একথা সে শিশুকাল থেকে বুঝে নিয়েছিল।

খ. প্রতাপ মাছ ধরার সময় একদিন সুভা তার কাছে গেলে প্রতাপ তাকে জানায় যে তার জন্য বর পাওয়া গেছে এবং খুব শিগগিরই তার বিয়ে হবে। প্রতাপ আরও বলে, বিয়ের পর যেন সুভা তাদের সবাইকে ভুলে না যায়। এই কথা শুনে সুভা প্রতাপের দিকে মর্মবিদ্ধ হরিণীর মতো তাকিয়ে থাকে।

সুভা প্রতাপকে খুব আপন মনে করত। প্রতাপের সঙ্গে কথা বলতে না পারলেও নীরবে তার পাশে বসে থাকত এবং তার মাছ ধরা দেখত। তাই প্রতাপের মুখে নিজের বিয়ের কথা শুনে সুভা খুব কষ্ট পায়। সে বিয়ে করতে চায়নি এবং প্রতাপের কাছ থেকে এমন কথা শুনবে, সেটিও ভাবেনি। তার মনের গভীর দুঃখ ও কষ্ট চোখের দৃষ্টিতে প্রকাশ পায়। আহত হরিণ যেমন শিকারির দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে, সুভার দৃষ্টিতেও তেমনই অসহায়তা ও বেদনা ফুটে উঠেছিল। তাই তার সেই দৃষ্টিকে মর্মবিদ্ধ হরিণীর দৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

গ. উদ্দীপকের নিক ভুজিসিকের সঙ্গে ‘সুভা’ গল্পের সুভার মানসিক শক্তি ও জীবনের পরিণতির ক্ষেত্রে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। ‘সুভা’ গল্পের সুভা ছিল বাক্‌প্রতিবন্ধী এক কিশোরী। ছোটবেলা থেকেই নিজের সীমাবদ্ধতার কারণে সে পরিবার ও সমাজের নানা অবহেলা সহ্য করেছে। এসব আচরণ তার মনে গভীর কষ্ট তৈরি করে এবং ধীরে ধীরে তার আত্মবিশ্বাস কমে যায়।

উদ্দীপকের নিক ভুজিসিক জন্ম থেকেই হাত-পা ছাড়াই জীবন শুরু করেন। কিন্তু নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে তিনি কখনো জীবনের বাধা হিসেবে মেনে নেননি। তিনি নিজের ওপর বিশ্বাস রেখেছেন এবং কঠোর চেষ্টা করে সফল হয়েছেন। বর্তমানে তিনি একজন প্রেরণাদায়ী বক্তা হিসেবে মানুষের মনে সাহস জাগান। অর্থাৎ শারীরিক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও তাঁর মনোবল ছিল অনেক শক্ত।

অন্যদিকে সুভার জীবন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। ছোটবেলা থেকেই চারপাশের মানুষের অবহেলা তাকে খুব কষ্ট দিত। কেউ তার সঙ্গে খেলতে চাইত না, তার মা-বাবাও তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতেন। ফলে সুভা নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা ভাবতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে তার আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়। সে নিজের জন্য কোনো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তার জীবনও সুখের হয়নি। তাই বলা যায়, প্রতিকূলতার মধ্যেও নিক ভুজিসিক দৃঢ় মনোবল নিয়ে সফল হয়েছেন, কিন্তু অবহেলা ও একাকিত্বের কারণে সুভার মনোবল দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ কারণেই তাঁদের মানসিক শক্তি ও জীবনের পরিণতির মধ্যে স্পষ্ট বৈসাদৃশ্য রয়েছে।

ঘ. শুভ পরিণতির কথা ভাবলে বলা যায়, উদ্দীপকের নিক ভুজিসিকের মতো ‘সুভা’ গল্পের সুভার মধ্যেও যদি দৃঢ় মনোবল ও নিজের ওপর বিশ্বাস থাকত, তাহলে তার জীবন হয়তো অন্য রকম হতে পারত। ‘সুভা’ গল্পে সুভা ছিল বাক্‌প্রতিবন্ধী। এই কারণে পরিবার ও সমাজের মানুষ তাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেনি। তাদের অবহেলা ও কষ্টের কথা শুনতে শুনতে সুভার আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়। ফলে তার জীবনের পরিণতিও সুখের হয়নি।

উদ্দীপকের নিক ভুজিসিক জন্ম থেকেই হাত-পা ছাড়াই জীবন শুরু করেন। তিনি বর্তমানে একজন সফল ও প্রেরণাদায়ী বক্তা। ছোটবেলায় নিজের শারীরিক অবস্থার কারণে তিনি অনেক কষ্ট পেয়েছেন। স্কুল ও আশপাশের মানুষের কাছ থেকেও তাকে নানা অপমান সহ্য করতে হয়েছে। একসময় তিনি বেঁচে থাকার আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু পরে নিজের প্রতি বিশ্বাস তৈরি করে তিনি ঘুরে দাঁড়ান। কঠিন অবস্থার মধ্যেও তিনি হাল ছেড়ে দেননি। তাঁর এই দৃঢ় মনোভাবই তাকে জীবনে সফল হতে সাহায্য করেছে।

অন্যদিকে ‘সুভা’ গল্পের সুভা ছোটবেলা থেকেই মানুষের অবহেলা ও কষ্টের মধ্যে বড় হয়েছে। এসব আচরণের কারণে সে নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা ও অসহায় ভাবতে শুরু করে। তার মনে হীনম্মন্যতা তৈরি হয় এবং সে নিজের কথা বা অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না। শেষ পর্যন্ত সে নিজের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার সুযোগ পায়নি। নিক ভুজিসিকের মতো যদি সুভার মধ্যেও নিজের ওপর বিশ্বাস ও দৃঢ় সংকল্প থাকত, তাহলে সে সমাজের অবহেলাকে জয় করে অন্যভাবে জীবন গড়তে পারত। তাই বলা যায়, নিক ভুজিসিকের মতো প্রত্যয় থাকলে সুভার জীবনও হয়তো অনেক সুন্দর ও সুখের হতে পারত।


সৃজনশীল প্রশ্নঃ ৪। [যশোর বোর্ড ২০২৬]
শান্ত তার গ্রামের বাড়ি ছেড়ে পরিবারের সাথে শহরে চলে যাবে। গ্রামের পুকুর, আমবাগান ও খেলার সাথিদের সঙ্গে-তার এক গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। বিদায়কালে বন্ধুরা তাকে বিদায় সম্ভাষণ জানাল। কিন্তু শান্তর বাবা বুঝতে পারল তার মনের অনুভূতি। শান্ত বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।

ক. প্রকৃতি সুভার কীসের অভাব পূরণ করে দেয়?

খ. ‘সুভা’ গল্পে ‘গ্রামলক্ষ্মী স্রোতম্বিনী’ কথাটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?

গ. উদ্দীপকের শান্তর খেলার সাথির সঙ্গে ‘সুভা’ গল্পের যে দিকটি বৈসাদৃশ্যপূর্ণ তা ব্যাখ্যা করো।

ঘ. “উদ্দীপকের শান্তর বাবার সমবেদনা ‘সুভা’ গল্পের বাণীকন্ঠের মতো সুতীব্র নয়”- মূল্যায়ন করো।
সৃজনশীল প্রশ্নঃ ৫। [চট্টগ্রাম বোর্ড ২০২৬]
রাতুল বিদ্যালয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় প্রায়ই পথের ধারে বসে থাকে। সবাই পৌছে গেলেও প্রায় প্রতিদিনই তার বিদ্যালয়ে পৌঁছতে দেরি হয়। এজন্য তার মনে খুব কষ্ট। তুহিন স্যার অন্যদের কাছ থেকে বিষয়টি জানতে পেরে রাতুলের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। এসে দেখেন রাতুল বসে আছে, তার পা দুটো ফোলা। তিনি তাকে কোলে তুলে নিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেন। তার চিকিৎসার বিষয়ে অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেন।

ক. সুভা কার কাছে মুক্তির আনন্দ পায়?

খ. পিতা-মাতার নীরব হৃদয়ভার- কথাটি দ্বারা লেখক কী বোঝাতে চেয়েছেন?

গ. উদ্দীপকের রাতুলের সঙ্গে ‘সুভা’ গল্পের সুভার সাদৃশ্যপূর্ণ দিকটি ব্যাখ্যা করো।

ঘ. উদ্দীপকের তুহিন স্যারকে ‘সুভা’ গল্পের সুভার বাবার সার্থক প্রতিনিধি বলা যায় কি? উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দাও।
সৃজনশীল প্রশ্নঃ ৬। [সিলেট বোর্ড ২০২৬]
গানিম-আল-মুফতাহ-এর জন্মের আগেই ডাক্তারের পক্ষ থেকে পিতামাতা জানতে পারেন তাঁর শরীরের নিচের অংশ নেই। ডাক্তারের পরামর্শকে উপেক্ষা করে গানিমকে তারা জন্ম দিলেন। মাতা পিতার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি হব সন্তানের বাম পা আর তুমি হবে তার ডান পা।’ একদিন যাঁর ভূমিষ্ঠ হওয়া নিয়েই যথেষ্ট সন্দেহ ছিল, তাঁর হাতেই উদবোধন হয় কাতার বিশ্বকাপ ফুটবল।

ক. সুভার ভাষার অভাব পূরণ করে দেয় কে?

খ, “আমি তোমার কাছে কী দোষ করেছিলাম”- সুভার এই নীরব উক্তির কারণ ব্যাখ্যা করো।

গ. উদ্দীপকের মাতা এবং ‘সুভা’ গল্পের মাতার চরিত্রগত দিকের তুলনা করো।

ঘ. “উদ্দীপকের চেতনাকে ধারণ করাই যেন ‘সুভা’ গল্পের মূল চাওয়া।”- উক্তিটির সপক্ষে যুক্তি দাও।
সৃজনশীল প্রশ্নঃ ৭। [ময়মনসিংহ বোর্ড ২০২৬]
দুর্ঘটনায় দৃষ্টিশক্তি হারালেও নিজাম দমে যাননি। মা-বাবা তাঁকে দৃষ্টিহীনদের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। তাঁর অদম্য চেষ্টা আর পরিবারের ঐকান্তিক সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে তিনি এখন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক।

ক. সুভার গ্রামের নাম কী?

খ. “কিন্তু বেদনা কি কেহ কখনো ভোলে?”- কথাটি ব্যাখ্যা করো।

গ. উদ্দীপকের নিজামকে কোন দিক দিয়ে ‘সুভা’ গল্পের সুভার সাথে মেলানো যায়? বুঝিয়ে লেখো।

ঘ. “সুভা যদি উদ্দীপকের নিজামের মতো সমর্থন পেত, তাহলে তার জীবনও নিজামের জীবনের মতো হতে পারত”-মন্তব্যটির পক্ষে তোমার যুক্তি তুলে ধরো।
সৃজনশীল প্রশ্নঃ ৮। [আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল, ঢাকা]
রায়হান সাহেব তার দুই মেয়ের মধ্যে ছোটো মেয়ে রেশমাকে অপেক্ষাকৃত বেশি ভালোবাসেন। কারণ, জন্মগতভাবেই রেশমার ডান হাতটি অকেজো। রেশমার মা পরিবারের বোঝা মনে করে রেশমাকে একদম দেখতে পারে না। কিন্তু রায়হান সাহেব রেশমাকে অনেক আদর, ভালোবাসা আর মায়া-মমতা দিয়ে আগলে রাখেন। রেশমার মা রেশমাকে আড়াল করে রাখতে চাইলেও বাবা তাকে একটি বিশেষ স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি তাকে আবৃত্তি ও গানের চর্চা করান। আবৃত্তি ও গানের মাধ্যমে রেশমা সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে।

ক. সাধারণ বালক-বালিকারা সুভাকে একপ্রকার ভয় করত কেন?

খ. সুভার সমস্ত হৃদয় অশ্রুবাষ্পে ভরে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করো।

গ. উদ্দীপকের রেশমার মায়ের মাঝে সুভার মায়ের যে দিকটি ফুটে উঠেছে তা ব্যাখ্যা করো।

ঘ. সাধারণের দৃষ্টিপথ হতে সুভা নিজেকে গোপন রাখার যে চেষ্টা চালাত, তা দূরীকরণে রেশমার বাবার পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি ও কার্যকর- বিশ্লেষণ করো।

সুভা গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন উত্তর পিডিএফ

📄PDF
📖 পড়ুন

Related Posts

Leave a Comment