সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘বহিপীর’ নাটকটি বাঙালি মুসলমান সমাজে প্রচলিত পীরপ্রথা ও কুসংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি মানবিক জাগরণ, নারীর স্বাধীনতা এবং পুরোনো সমাজব্যবস্থা থেকে নতুন জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলে। তাহেরা ও হাশেমের নতুন পথের যাত্রা তাই শুধু তাদের ব্যক্তিগত জীবনের পরিবর্তন নয়; এটি একটি নতুন জীবনের স্বপ্নকে তুলে ধরে। এই পোস্টে বহিপীর নাটকের মূলভাব ও বর্ণনামূলক প্রশ্ন উত্তর লিখে দিলাম।
Table of Contents
বহিপীর নাটকের মূলভাব
‘বহিপীর’ নাটকের গল্প শুরু হয় ডেমরার ঘাটে জমিদার হাতেম আলির বজরায়, যেখানে গত রাতের ঝড়ে বহিপীর ও তার খাদেম হকিকুল্লাহ প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নেন। বজরার ভেতরে আছেন জমিদারপত্নী খোদেজা বেগম, তাঁর ছেলে হাশেম আলি ও তাহেরা নামের এক তরুণী, যাকে খোদেজা বেগম গতকাল ঘাটে এক ক্ষুধার্ত ছেলেকে নিয়ে বিপদে পড়তে দেখে বজরায় ডেকে এনেছিলেন। তাহেরা জানান, তার বাবা ও সৎমা তাকে এক বৃদ্ধ পীরের সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সেই অন্যায় বিয়ে মেনে না নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়েছেন। অন্যদিকে বহিপীর জমিদারকে জানান যে তিনি বইয়ের ভাষায় কথা বলেন বলেই তাঁর নাম ‘বহিপীর’, আর জমিদার হাতেম আলি চিকিৎসার অজুহাতে শহরে গেলেও আসলে তাঁর জমিদারি সূর্যাস্ত আইনে নিলামে উঠতে চলেছে এবং তিনি টাকা সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছেন। তাহেরা হাশেমের কাছ থেকে জানতে পারে যে এই বৃদ্ধ লোকটিই সুনামগঞ্জের বহিপীর, যার সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল, তখন সে নদীতে ঝাঁপ দিতে চায় কিন্তু হাশেম তাকে বাধা দিয়ে আশ্বস্ত করে। বহিপীর জমিদারকে তার সফরের আসল কারণ জানান এবং বলেন যে তাহেরা তাঁর বিয়ে করা বিবি, কিন্তু খোদেজা বেগম অনেক বুঝিয়েও তাহেরাকে বিয়ে মানাতে পারেন না, আর হাশেম মানবিক কারণে তাহেরার পক্ষ নিয়ে দাঁড়ান। বহিপীর প্রথমে ধর্মীয় যুক্তি দেন, পরে মানবিকতার বাহানা করেন, সব ব্যর্থ হলে তিনি জমিদারের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অর্থ দিয়ে জমিদারি রক্ষার প্রস্তাব দেন এবং শর্ত হিসেবে তাহেরাকে ফিরে পেতে চান। খোদেজা বেগম এই প্রস্তাব আল্লাহর রহমত মনে করে রাজি হন এবং তাহেরাকে ফিরে যেতে বলেন, তাহেরাও ভাবে যে তার আত্মসমর্পণে পুরো জমিদার পরিবার বাঁচবে, তাই রাজি হয়ে যায়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে জমিদার হাতেম আলি নিজেকে স্বার্থপর মনে করে পীরের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন, আর তাহেরা ও হাশেম একসঙ্গে পালিয়ে যান। বহিপীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন যে তারা নতুন জীবনের পথে চলে গেছে, আর খোদেজা বেগমের ভবিষ্যৎ চিন্তার জবাবে তিনি বলেন আমরা তো আছি, পুরোনো পৃথিবীতেই সুখে বাকি দিন কাটাবো, আর এভাবেই নাটকটি শেষ পর্যন্ত মানবিক জাগরণের বার্তা দিয়ে পুরোনো কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জয়ের গল্প বলে।
বহিপীর নাটকের বিষয়বস্তু
ডেমরার ঘাটে ভোরের আলো ফুটেছে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে রেশমপুরের জমিদার হাতেম আলির বজরা। গত রাতে প্রবল ঝড়ে একটি নৌকা ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সেই নৌকা থেকে বহিপীর ও তার খাদেম হকিকুল্লাহ প্রাণ বাঁচাতে জমিদারের বজরায় আশ্রয় নেন। বজরার ভেতরের কামরায় রয়েছেন জমিদারপত্নী খোদেজা বেগম, তাঁর ছেলে হাশেম আলি এবং তাহেরা নামের এক তরুণী।
গতকাল ঘাটে তাহেরা একটি ছোট ছেলেকে নিয়ে খুব বিপদে পড়েছিল। ছেলেটি ক্ষুধায় কাঁদছিল, আর কিছু দুর্বৃত্ত তাহেরাকে নিয়ে ঠাট্টা করছিল। খোদেজা বেগম তখন তাঁকে বজরায় ডেকে আনেন। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন, তাহেরার বাবা ও সৎমা তাকে এক বৃদ্ধ পীরের সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই অন্যায় বিয়ে মেনে না নিয়ে তিনি বাড়ি থেকে পালিয়েছেন।
অন্যদিকে, বহিপীর জমিদারকে জানান, তিনি দেশের বিভিন্ন জায়গায় মুরিদ তৈরি করেন। প্রত্যেক স্থানের ভাষা আলাদা, তাই তিনি বইয়ের ভাষায় কথা বলেন, তাই তাঁর নাম ‘বহিপীর’। জমিদার হাতেম আলি বলেন, তিনি শহরে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন। কিন্তু আসলে তিনি গোপন করেছেন যে তাঁর জমিদারি সূর্যাস্ত আইনে নিলামে উঠতে চলেছে, আর তিনি বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন।
এই কথোপকথন শুনে তাহেরার সন্দেহ হয়। হাশেমের কাছ থেকে জানতে পারে, এই বৃদ্ধ লোকটিই সুনামগঞ্জের বহিপীর, যাকে তার বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাহেরা তখন বজরার জানালা দিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিতে চায়। হাশেম তাকে থামায় এবং আশ্বস্ত করে যে তার অমতে তাকে পীরের হাতে তুলে দেওয়া হবে না।
এরপর বহিপীর জমিদারকে তার সফরের আসল কারণ খুলে বলেন এবং জানান, তাঁর বিয়ে করা বিবি (তাহেরা) এই বজরাতেই আছে। জমিদারপত্নী বহু চেষ্টা করেও তাহেরাকে পীরের বিয়ে মানাতে পারেন না। হাশেম মানবিক কারণে তাহেরার পক্ষ নিয়ে দাঁড়ায়। তিনি তাহেরাকে বাঁচাতে চান, এমনকি বিয়ে করে হলেও।
বহিপীর প্রথমে ধর্মীয় বিয়ের দোহাই দেন, তাহেরা যুক্তি দিয়ে তা খারিজ করে দিলে তিনি মানবিকতার বাহানা করেন। সব কাজ না হওয়ায় তিনি জমিদারের অসহায়ত্বের সুযোগ নেন। তিনি প্রস্তাব দেন, তিনি জমিদারির সব টাকা দেবেন, বিনিময়ে তাহেরাকে ফিরে পেতে চান। খোদেজা বেগম একে আল্লাহর রহমত মনে করে রাজি হন এবং তাহেরাকে ফিরে যেতে বলেন।
তখন তাহেরা ভাবে, তাঁর আত্মসমর্পণে পুরো জমিদার পরিবার রক্ষা পাচ্ছে। তিনি রাজি হয়ে যান। কিন্তু একদম শেষ মুহূর্তে জমিদার হাতেম আলি বেঁকে বসেন। তিনি নিজেকে খুব ছোট ও স্বার্থপর মনে করেন। তাঁর মানবিক বোধ জেগে ওঠে, তিনি পীরের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।
এক পর্যায়ে তাহেরা ও হাশেম পালিয়ে যান। বহিপীর তাঁদের থামাতে চাইলে জমিদার বাধা দেন। শেষে বহিপীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, তারা নতুন জীবনের পথে চলে গেছে, আমরা তাদের কী করে আটকাব? খোদেজা বেগম ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করলে বহিপীর বলেন, আমরা তো আছি, আমাদের পুরোনো পৃথিবী আছে, বাকি দিন সুখে কাটাবো, চিন্তার কী আছে?
এই নাটকটি পীরপ্রথার সমালোচনা করলেও শেষ পর্যন্ত মানবিক জাগরণের বার্তা দেয়। এটি আমাদের শেখায়, পুরোনো কুসংস্কার ও স্বার্থের জায়গায় শেষ পর্যন্ত সত্য আর মানবতা জয়ী হয়।
বহিপীর নাটকের বর্ণনামূলক প্রশ্ন
| প্রশ্ন ১। ক. ‘সূর্যাস্ত আইন’ জমিদার হাতেম আলির জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে? | ৩ |
| খ. বহিপীর ও হাতেম ‘আলির সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করো | ৭ |
ক) উত্তরঃ ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ সরকার ‘সূর্যাস্ত আইন’ নামে একটি কঠিন নিয়ম চালু করে। এই আইন অনুযায়ী, জমিদারদের নির্দিষ্ট দিনে সূর্য ডোবার আগে সরকারি খাজনা মেটাতে হতো। যদি কেউ সময়মতো টাকা জমা দিতে না পারত, তাহলে তার সম্পূর্ণ জমিদারি নিলামে তুলে দেওয়া হতো। ‘বহিপীর’ নাটকের জমিদার হাতেম আলি ঠিক এমনই এক বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে। তিনি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাওয়া জমিদার পরিবারের প্রতিনিধি। এক সময় তাদের বাড়িতে দাপট ছিল, কিন্তু বংশপরম্পরায় সেই জৌলুস কমতে থাকে। নাট্যকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ হাতেম আলির বর্তমান অবস্থাকে ‘ঢাকের ঢোল’ বলে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ বাইরের আভিজাত্য আছে, কিন্তু ভেতরে শূন্যতা। গ্রামের মানুষ এখনও তাদের সম্মান করে, আর এই সামান্য সম্মানটুকু ধরে রাখার জন্য জমিদারিটাই ছিল হাতেম আলির একমাত্র ভরসা। তাঁর আর কোনো আয়ের পথ নেই। বাড়ির খরচ, মর্যাদা, সবকিছুই এই জমিদারির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু খাজনা জমা না দেওয়ায় সেই জমিদারিও এখন নিলামে ওঠার মুখে। এই আইনটাই হাতেম আলির জীবনে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করেছে। তাই বলা যায়, ‘সূর্যান্ত আইন’ হাতেম আলির জীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে।
খ) উত্তরঃ ‘বহিপীর’ নাটকে বহিপীর ও হাতেম আলির সম্পর্কের শুরুটা হয় আশ্রয়হীনতা আর আশ্রয়দাতার ভূমিকায়।
বহিপীর সুনামগঞ্জের মানুষ, এই এলাকার নন। তিনি বছরের বিভিন্ন সময় দেশের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান তাঁর মুরিদদের কাছে। এখানেও তাঁর একজন প্রিয় মুরিদ আছে, যে নিজের মেয়ে তাহেরাকে বৃদ্ধ পীরের সঙ্গে বিয়ে দেয় পীরের আশীর্বাদ পেতে। কিন্তু তাহেরা এই অসম বয়সের বিয়েতে রাজি না হয়ে বিয়ের রাতে বাড়ি ছেড়ে পালায়। বহিপীর তখন তাঁর খাদেম হকিকুল্লাহকে নিয়ে নববধূকে খুঁজতে বের হন। নৌকায় যাওয়ার সময় প্রচণ্ড ঝড় ওঠে এবং বহিপীরের নৌকা জমিদারি বজরার সঙ্গে ধাক্কা খায়। আধডোবা অবস্থায় জমিদার হাতেম আলি তাঁকে উদ্ধার করেন।
অন্যদিকে হাতেম আলি রেশমপুরের একজন ক্ষয়িষ্ণু জমিদার। তাঁর সামান্য জমিদারি সান্ধ্য আইনে নিলামে চলে যেতে বসেছে, তাই তিনি শহরে বন্ধু আনোয়ারউদ্দিনের কাছে টাকা ধার করতে গিয়েছিলেন। প্রথমে তিনি স্ত্রী-পুত্র এমনকি বহিপীরের কাছেও এই সংবাদ গোপন রাখেন, কিন্তু বন্ধুর কাছ থেকে ধার না পেয়ে হতাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত বহিপীরের কাছে সবকিছু খুলে বলেন।
বহিপীর প্রথমে হাতেম আলির এই অসহায়ত্বের সুযোগ নেন। তিনি জানতে পারেন যে তাঁর পলাতক স্ত্রী তাহেরা ঠিক এই বজরায় আছে, তাই তিনি জমিদারকে শর্ত দেন তাহেরাকে তাঁর সঙ্গে ফিরতে দিলে তিনি টাকা ধার দেবেন। বহিপীর বলেন, শহরে তাঁর কিছু ধনী মুরিদ আছে, তাদের কাছ থেকে টাকা এনে তিনি জমিদারি রক্ষার ব্যবস্থা করে দেবেন। কিন্তু হাতেম আলি প্রথমে এই শর্তের আসল মানে বুঝতে পারেন না। তিনি একজন মর্যাদাবান মানুষ, তাই বিপদের মধ্যেও তিনি এমন শর্তে টাকা নিতে অস্বীকার করেন।
অন্যদিকে পিরসাহেবও নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং বিনা শর্তে হাতেম আলিকে সাহায্য করতে রাজি হন। এই দুই চরিত্রের সম্পর্কের গভীরে তাকালে দেখা যায়, দুজনেই ভীষণ দুশ্চিন্তায় নিমগ্ন। বহিপীরের মাথায় শুধু একটাই চিন্তা কী করে তাঁর পালানো স্ত্রী তাহেরাকে খুঁজে বের করবেন এবং বুঝিয়ে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। অন্যদিকে হাতেম আলি শত বছরের পুরোনো জমিদারি হারানোর ভয়ে কাতর। তাঁর কাছে এই জমিদারি শুধু সম্পত্তি নয়, বরং গ্রামে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা। জমিদারি গেলে তাঁর মান-ইজ্জতও চলে যাবে। এই শঙ্কা তাকে রাতদিন জর্জরিত করে। তাই দুজনেই নিজ নিজ সংকটে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। বহিপীর যেমন তাঁর পরিবারের অসম্মান ঠেকাতে মরিয়া, হাতেম আলিও তেমনই তাঁর বংশের মর্যাদা বাঁচাতে উদগ্রীব। তাই হাতেম আলি ও পিরসাহেবকে গভীর দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে মেলানো যেতে পারে।
| প্রশ্ন ২। ক. “খোদা কাকে কীভাবে পরীক্ষা করেন তা বুঝিবার ক্ষমতা আমাদের নাই।”- উক্তিটি কার? কেন তিনি একথা বলেছিলেন? | ৩ |
| খ. ‘বহিপীর’ নাটকে নাট্যকার কোন কোন সামাজিক সমস্যার আলোকপাত করেছেন? উদাহরণসহ আলোচনা করো। | ৭ |
ক) উত্তরঃ “খোদা কাকে কীভাবে পরীক্ষা করেন তা বুঝিবার ক্ষমতা আমাদের নাই”—বহিপীরের এই কথাটি তিনি বলেন জমিদার হাতেম আলিকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে।
হাতেম আলি তখন জমিদারি হারানোর ভয়ে সম্পূর্ণ বিচলিত। বহিপীর মনে করেন, বিপদের সময় আত্মহারা হয়ে পড়া ঠিক নয়। বরং ধৈর্য ধরে বিপদ কাটানোর চেষ্টা করা উচিত। কিন্তু যখন সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন আর ধৈর্য ধরে রাখা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়ে। হাতেম আলির ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছে। তাঁর জমিদারি সান্ধ্য আইনে নিলামে ওঠার উপক্রম। তিনি স্ত্রী-সন্তানকে মিথ্যা বলে চিকিৎসার অজুহাতে শহরে যান নিজের বাল্যবন্ধু আনোয়ারউদ্দিনের কাছে। ভেবেছিলেন ধনী এই বন্ধু তাকে আর্থিক সাহায্য করবেন, কিন্তু উল্টো বন্ধুও তাকে নিরাশ করে দেন। তখন হাতেম আলির পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যায়। তিনি হতাশায় দুচোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করেন। এই করুণ অবস্থায় বহিপীর তাঁর পাশে দাঁড়ান এবং তাকে সান্ত্বনা দিয়ে সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রাখার পরামর্শ দেন। বহিপীরের মতে, সৃষ্টিকর্তা মানুষকে বিভিন্ন বিপদ দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন। হাতেম আলির জমিদারি যাওয়ার আশঙ্কাও হয়তো তেমনই এক পরীক্ষা, যা তাকে আরও শক্তিশালী করবে। তাই বহিপীর মনে করেন, এই কঠিন সময়েও বিচলিত না হয়ে সৃষ্টিকর্তার ওপর আস্থা রাখাই সবচেয়ে ভালো পথ।
খ) উত্তরঃ ‘বহিপীর’ নাটকে নানাবিধ সামাজিক সমস্যার ইঙ্গিত রয়েছে। নিচে কয়েকটি সমস্যার উল্লেখ করা হলো-
প্রথমত, নাটকের নামকরণেই পীর সম্প্রদায়ের ধর্মব্যবসার ইঙ্গিত রয়েছে। সুফিবাদের ভিত্তিতে পীর-মুরিদ প্রথা শুরু হলেও বর্তমানে তা ব্যবসার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বহিপীর বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অঞ্চলে মুরিদদের কাছে যান, আর মুরিদরা তাঁদের সর্বস্ব দিয়ে পীরের সেবা করে হালের গরু, ছাগল-মুরগি দিয়ে আপ্যায়ন করে, এমনকি ঋণ করেও পীরের খাতির করে। তাহেরার বাবা-মা পীরকে খুশি করতে নিজের কিশোরী কন্যাকে বিয়ে দেয়, আর বহিপীরের দৃঢ় বিশ্বাস যে তাঁর ধনী মুরিদরা চাইলে জমিদারি রক্ষার টাকা জোগাড় করে দিতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও ধর্মভীতি এই নাটকের আরেকটি বড় সমস্যা। বাস্তবজ্ঞানহীন ধর্মভীতিই ধর্মীয় ব্যবসায়ীদের লাভবান করে। খোদেজা চরিত্রটি তার প্রমাণ। তিনি জানেন তাহেরার সঙ্গে বহিপীরের বিয়ে অন্যায়, তবুও তিনি বহিপীরকেই সমর্থন করেন শুধু তাঁর বদদোয়া লাগার ভয়ে।
তৃতীয়ত, অসম বয়সের বিবাহ এই নাটকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলায় কৌলীন্য প্রথার সূত্র ধরে এই প্রথা চালু হয়, মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ প্রহসনে আশি বছর বয়স্ক কুলীন ব্রাহ্মণের সঙ্গে আট বছরের শিশুকন্যার বিয়ের উদাহরণ যেমন আছে, তেমনি এ নাটকে পঞ্চাশোর্ধ্ব বহিপীরের সঙ্গে কিশোরী তাহেরার বিয়ে সেই একই সামাজিক ব্যাধিকে তুলে ধরে।
চতুর্থত, নাটকে নারীসমাজের প্রতি সামাজিক অবমাননার দিকটিও স্পষ্ট। তাহেরার ঘর ছেড়ে পালিয়ে আসা সাহসী কাজ হলেও জমিদারপত্নী খোদেজা বিষয়টি ভালোভাবে নেননি, বরং নানাভাবে তাহেরাকে হেয় করেছেন। পঞ্চমত, ইংরেজদের রেখে যাওয়া জমিদারি প্রথার ভাঙনও এ নাটকের একটি উল্লেখযোগ্য সমস্যা। হাতেম আলি একজন ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বাপ-দাদার আমলে নাম-ডাক থাকলেও এখন তা কেবল ঢাকের ঢোলের মতো, তাও সান্ধ্য আইনে নিলামে ওঠার মুখে। এসব সমস্যা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নাট্যকার তাঁর নাটকে তুলে ধরেছেন।
| প্রশ্ন ৩। ক. তাহেরা কেন বহিপীরের সাথে ফিরে যেতে চেয়েছিল? ব্যাখ্যা করো। | ৩ |
| খ. হাশেমকে কি প্রতিবাদী চরিত্র বলা যায়? তোমার মন্তব্যের পক্ষে যুক্তি প্রদান করো। | ৭ |
ক) উত্তরঃ জমিদার হাতেম আলি ছিলেন তাহেরার আশ্রয়দাতা, আর এই উপকারের বিনিময়ে তিনি তাঁর জমিদারি রক্ষার জন্যই তাহেরা শেষ পর্যন্ত বহিপীরের সঙ্গে যেতে রাজি হয়েছিলেন। তাহেরা সৎমায়ের সংসারে বেড়ে ওঠা এক মেয়ে, যার সৎমাই তাকে বৃদ্ধ পীরের সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এই অসম বয়সের বিয়ের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হন এবং বাড়ি থেকে পালিয়ে জমিদারের বজরায় আশ্রয় নেন। জমিদার হাতেম আলি ও তাঁর স্ত্রী খোদেজা তখন অসহায় তাহেরাকে নিজের মতো করে আশ্রয় দেন, আর খোদেজা তাকে কন্যার সমতুল্য মনে করেন, তাই তাহেরা তাদের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ ছিল। ঘটনাক্রমে বহিপীর ঝড়ের কবলে পড়ে সেই বজরাতেই আশ্রয় নেন এবং জানতে পারেন তাঁর পলাতক নববধূ তাহেরা এই বজরায় রয়েছে। তখন ধূর্ত বহিপীর জমিদার হাতেম আলিকে শর্ত দেন তিনি তাঁকে জমিদারি রক্ষার টাকা দেবেন, কিন্তু বিনিময়ে তাঁকে তাঁর স্ত্রী তাহেরাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। অন্যদিকে তাহেরা দেখেন যে তাঁর আশ্রয়দাতা জমিদার হাতেম আলি এখন ভয়াবহ সংকটে পড়েছেন। তিনি বুঝতে পারেন, এই সুযোগেই হয়তো তিনি জমিদারের উপকার করতে পারেন। তাই কৃতজ্ঞতাবশে এবং জমিদারের জমিদারি রক্ষার তাগিদে তিনি রাজি হয়ে যান বহিপীরের সঙ্গে ফিরে যেতে চান।
খ) উত্তরঃ হ্যাঁ, হাশেমকে প্রতিবাদী চরিত্র বলা যায়।
‘বহিপীর’ নাটকের অন্যতম প্রধান এই চরিত্রটি জমিদারপুত্র হলেও প্রচলিত জমিদারি ব্যবস্থায় গড়ে ওঠা লাম্পট্য যুবকদের মতো নয়। হাশেম আলি উচ্চশিক্ষিত ও বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। জমিদারপুত্র হয়েও পিতার জমিদারির প্রতি তার কোনো আগ্রহ নেই, বরং তিনি ব্যবসা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান, তাই বাবার কাছে ছাপাখানার ব্যবসা দেওয়ার স্বপ্ন ব্যক্ত করেছেন। মানবীয় মূল্যবোধ ও ন্যায়বোধের গুরুত্ব তার কাছে সর্বাধিক, তাই এক অর্থে হাশেম আলিকে নায়কও বলা যেতে পারে।
বৈষয়িক বিবেচনা তার কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ। পিতার জমিদারি চলে গেলে বা ছাপাখানা না বসালেও তিনি চিন্তিত নন, বরং মনে করেন যখন লেখাপড়া করেছেন তখন কোনো না কোনো কাজ হবে। অসম বিয়ে মেনে না নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসা তাহেরার সমস্যা হাশেমই প্রথম উপলব্ধি করেন এবং তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েন। মেয়েটি আত্মহননের জন্য নদীতে ঝাঁপ দিতে চাইলে তিনিই তাকে রক্ষা করেন। পুরো বজরার মানুষ তাহেরার বিপক্ষে গেলেও একমাত্র হাশেম তার পক্ষে ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই পক্ষ ত্যাগ করেননি। নাটকে তাকে অস্থিরচিত্ত বললেও তিনি নিজের অবস্থানে ছিলেন সম্পূর্ণ স্থির। মাতার সাবধান বাণী, বহিপীরের ভীতি প্রদর্শন, পিতার করুণ অবস্থা কোনোকিছুই তাকে পিছু হটাতে পারেনি। তিনি তাহেরাকে বাঁচাতে চেয়েছেন, এমনকি বিয়ে করে হলেও।
জমিদারপুত্র হিসেবে তাহেরা তার কাছে অপরিচিতা, তবু শেষ পর্যন্ত তিনি সব বৈষয়িক ভাবনা ত্যাগ করে মেয়েটিকে বাঁচাতে সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন এবং সবকিছু ছিন্ন করে অচেনা মেয়েটিকে নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে নিরুদ্দেশ হন। হাশেমের শিক্ষা কেবল বাহ্যিক নয়, তার মনুষ্যত্ব গঠনেও গভীর ভূমিকা রেখেছে। তিনি সব ধরনের সংকীর্ণতামুক্ত এক আধুনিক যুবক। প্রেসের ব্যবসার সম্ভাবনা বিনষ্ট হলেও তিনি চিন্তিত নন, আর মায়ের সাবধানবাণী, বহিপীরের ভীতি বা পিতার করুণ অবস্থা তাকে মনুষ্যত্বহীন কাজ করতে প্রস্তুত করেনি। সমাজের প্রচলিত অসম বিয়ের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়েছেন এবং সেই বিয়ের শিকার তাহেরাকে নিয়ে পালিয়ে তাঁর প্রতিবাদী ব্যক্তিত্বকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাই তাকে নিঃসন্দেহে প্রতিবাদী যুবক বলা যায়।
| প্রশ্ন ৪। ক. “কথ্য ভাষা হইল মাঠ-ঘাটের ভাষা, খোদার বাণী বহন করার উপযুক্ততা তাহার নাই।”- এ উক্তি কে এবং কেন করেছিল? | ৩ |
| খ. “নাটকে সাহস এবং স্বাধীনতার প্রতীক হচ্ছে তাহেরা।”-তাহেরা চরিত্রটির প্রধান বৈশিষ্ট্য নির্দেশপূর্বক এ মন্তব্য বিশ্লেষণ করো। | ৭ |
ক) উত্তরঃ “কথ্য ভাষা হইল মাঠ-ঘাটের ভাষা, খোদার বাণী বহন করার উপযুক্ততা তাহার নাই।”- উক্তিটি ‘বহিপীর’ তার নাম প্রসঙ্গে করেছিল।
‘বহিপীর’ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র তিনি, কিন্তু তিনি এখানকার মানুষ নন, তাঁর বাড়ি সুনামগঞ্জে। বছরের বিভিন্ন সময় তিনি বাংলাদেশের নানা অঞ্চলে তাঁর মুরিদদের বাড়িতে কাটান, আর সারা বছরই তাকে ওয়াজ-নসিহত করতে হয়। দেশের সর্বত্র তাঁর মুরিদ থাকায় আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ একেক অঞ্চলের ভাষা একেক রকম। তাই বহিপীর বাধ্য হয়েই বইয়ের ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছেন। তিনি মনে করেন, কথ্য ভাষা হলো সাধারণ মানুষের মাঠ-ঘাটের ভাষা, যা খোদার বাণী বহন করার মতো যথাযথ নয়। তাঁর ধারণায়, ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত সৃষ্টিকর্তার দিকনির্দেশনামূলক উপদেশকে যথাযথভাবে ধারণ করার গুরুগম্ভীর বৈশিষ্ট্য কেবল বইয়ের ভাষারই রয়েছে। আঞ্চলিক কথ্য ভাষায় সেই গাম্ভীর্য ও সক্ষমতা নেই, তাই তিনি খোদার বাণী প্রচারের জন্য বইয়ের ভাষাকেই বেশি উপযুক্ত মনে করেন। এই কারণেই তিনি ‘বহিপীর’ নামে পরিচিত হয়েছেন যিনি বইয়ের ভাষায় পীরের কাজ করেন।
খ) উত্তরঃ ‘বহিপীর’ নাটকের সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্র তাহেরা। সে মাতৃহীন, সৎমায়ের সংসারে বেড়ে ওঠা এক মেয়ে, যার বাবা ও সৎমা তার মতামতকে উপেক্ষা করে বৃদ্ধ পীরের সঙ্গে তার বিয়ে দেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সে বাড়ি ছেড়ে পালায়, তাই তাহেরাকে সাহস ও স্বাধীনতার প্রতীক বলা যায়।
নিজের অমতে বিয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ঘর ছেড়ে পালানো তৎকালীন সমাজে কোনো মেয়ের পক্ষে সহজ কাজ ছিল না, ফলে সে নিঃসন্দেহে দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। নানাবিধ আশঙ্কা উপেক্ষা করে পালিয়ে সে সমাজে নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দিকটি উন্মোচন করেছে। ব্যক্তিমানুষ হিসেবে সমাজে নারী-পুরুষ উভয়েরই সমঅধিকার থাকা উচিত, আর বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মতামত জানানো প্রত্যেকের অধিকার। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় কর্তৃত্ববান পুরুষের মতামত নেওয়া হলেও নারীরা সব সময় অবহেলিত থেকেছে। তাহেরার মতো প্রতিবাদী নারীরা তাদের সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, আর সেদিক থেকে তাহেরা চরিত্রে দুঃসাহসিকতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয়ত, জন্মগতভাবে প্রত্যেক ব্যক্তিই স্বাধীন, মতামতের ব্যাপারেও তাই। অপরের মতকে অগ্রাহ্য করার স্বাধীনতা সবার আছে। তাহেরার বাবা-মায়ের সিদ্ধান্ত তার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না, তাই তিনি ব্যক্তিস্বাধীনতার বলে সেই বিয়েকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পালিয়ে এসেছেন, যা তার ব্যক্তিস্বাধীনতাকে নির্দেশ করে। উপর্যুক্ত আলোচনায় দেখা যায়, সমাজ ও পারিবারিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাহেরার অবস্থান স্পষ্ট। একাকী মেয়ের পক্ষে বাড়ি থেকে পালিয়ে অনিশ্চয়তার দিকে পা বাড়ানো ভীতুদের কাজ নয়, তাই তাহেরা পালিয়ে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে।
আবার প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাধীনতা রয়েছে পারিবারিক অবিবেচনামূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মত প্রকাশের, আর তাহেরা সেই স্বাধীনতারই পরিচয় দিয়েছে। তাই নাটকে তাকে সাহস ও স্বাধীনতার প্রতীক বলা যায়।
| প্রশ্ন ৫। ক. বহিপীর চরিত্রের ইতিবাচক উপাদানগুলো বর্ণনা করো। | ৩ |
| খ. সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় গোঁড়ামির যে চিত্র ‘বহিপীর’ নাটকে প্রতিফলিত হয়েছে তার পরিচয় দাও। | ৭ |
ক) উত্তরঃ ‘বহিপীর’ নাটকের বহিপীর চরিত্রটি অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও স্থিরবুদ্ধিসম্পন্ন। অসম বয়সে বিয়ের জন্য তাকে নানাবিধ প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, কিন্তু তিনি সবকিছু অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। তাঁর প্রথম স্ত্রী মারা যান চৌদ্দ বছর আগে, আর বৃদ্ধ বয়সের নিঃসঙ্গতা কাটাতে মুরিদের কন্যাকে বিয়ে করার অনুরোধ তিনি ফেলতে পারেননি। বিয়ের রাতে স্ত্রী পালিয়ে গেলে তিনি তাকে খুঁজতে বেরিয়েছেন, কিন্তু পুলিশি হস্তক্ষেপ তিনি পরিত্যাগ করেছেন। তাহেরাকে ফিরিয়ে আনতে তিনি প্রথমে ধর্মের দোহাই দিয়েছেন, তাতে মন না গলায় পুলিশের ভয় দেখিয়েছেন, তারপর মানবিকতার বাহানা দিয়ে তার সহানুভূতি পেতে চেয়েছেন। সবকিছুই করেছেন স্থিরচিত্তে। শেষমেশ হাতেম আলিকে টাকা ধার দেওয়ার শর্ত হিসেবে তাহেরাকে ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু তাহেরা হাশেমের সঙ্গে চলে গেলে তিনি বিনা শর্তেই হাতেম আলির জমিদারি রক্ষার টাকা দিয়ে দিয়েছেন। তাই একদিক থেকে বিচার করলে বলা যায়, বহিপীর তাহেরার জন্য একটি নিশ্চিত ‘স্থান’ দেখতে চেয়েছেন। সমাজে তার কোনো ঠিকানা ছিল না, আর বহিপীর তাকে সেই ঠিকানা দিতে চেয়েছিলেন। নাটকের এই দিকটি বিবেচনায় আনলে বহিপীর চরিত্রটি সম্পূর্ণ ইতিবাচক বলেই মনে হয়, কারণ তিনি কখনোই জোরজবরদস্তি বা রোষের পথ না নিয়ে বরং ধৈর্য ও যুক্তির মাধ্যমেই নিজের লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা করেছেন।
খ) উত্তরঃ ‘বহিপীর’ নাটকে বহিপীর ও খোদেজা চরিত্রের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় গোঁড়ামির একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে।
বহিপীর চরিত্রটি গ্রামীণ মানুষের কুসংস্কারকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠা পীর সম্প্রদায়ের ধর্মব্যবসার স্বরূপ তুলে ধরেছেন। তাঁর বাড়ি সুনামগঞ্জে, আর বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর মুরিদ রয়েছে। তিনি সারা বছর মুরিদদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ওয়াজ-নসিহত করেন এবং তাদের কাছ থেকে সেবা নেন। তাঁর মুরিদরা তাঁর কথায় সব করতে রাজি। হালের গরু বিক্রি করে, ছাগল-মুরগি জবাই করে পীরের সেবায় মরিয়া হয়ে ওঠে, সামর্থ্য না থাকলেও কর্জ করে হলেও পীরের খাতির করে। এমনকি এক মুরিদ ও তার স্ত্রী নিজেদের বালিকাকন্যা তাহেরাকে পঞ্চাশোর্ধ্ব বৃদ্ধ পীরের সঙ্গে বিয়ে দেয়, যদিও তাহেরা তা মেনে নেয়নি।
বহিপীরের শহরের ধনী মুরিদরা পীর সাহেবকে হাতেম আলির জমিদারি রক্ষার টাকা দিতেও কসুর করবে না। এই তথ্যটি বাংলাদেশের সমাজে জেঁকে বসা পীর-মুরিদি নামক ধর্মব্যবসার আসল রূপ উন্মোচন করেছে। অন্যদিকে খোদেজা, জমিদার হাতেম আলির স্ত্রী, নাটকের একটি অপ্রধান কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তিনি অত্যন্ত কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও ধর্মভীরু। তাহেরার সঙ্গে বহিপীরের অসম বিয়ে যে অন্যায়, তা তিনি বুঝতে পারেন, কিন্তু পীরের অভিশাপের ভয়ে তিনি এই কাজকে অস্বীকার করেন না। ছেলে হাশেম তাহেরাকে উদ্ধার করতে চাইলে তিনি পীরের অভিশাপের কথা বলে নিষেধ করেন, এমনকি ছেলে ও পীর মুখোমুখি হলে তিনি পীরের পক্ষেই অবস্থান নেন। অথচ তিনি নিজের ছেলেকেও শক্তভাবে দমন করতে পারেননি।
পীরভক্ত, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও ভীতু প্রকৃতির এমন খোদেজাদের কারণেই সমাজে এখনো পীর সম্প্রদায়ের ধর্মব্যবসা টিকে আছে। বহিপীরের জীবনাচরণ ও তাঁর মুরিদদের সর্বস্ব দিয়ে পীরকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা যেমন ধর্মীয় গোঁড়ামির চিত্র ফুটিয়ে তোলে, তেমনি খোদেজার কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও ধর্মীয় গোঁড়ামি সেই ধর্মব্যবসা বৃদ্ধির সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে। বহিপীর যেখানে ধর্মব্যবসায়ী, সেখানে খোদেজা সেই ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ।
বহিপীর নাটকের বর্ণনামূলক প্রশ্ন উত্তর পিডিএফ
নিচের পিডিএফ ফাইলে বহিপীর নাটকের বর্ণনামূলক প্রশ্ন ও উত্তর আরও বেশি দেওয়া আছে।