অভাগীর স্বর্গ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন উত্তর

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পটিতে একদিকে যেমন সমাজের ধনী শ্রেণির জাঁকজমকপূর্ণ দৃশ্য দেখিয়েছেন, অন্যদিকে গরিব কাঙালীর মার চোখ দিয়ে দেখিয়েছেন এক প্রকার শ্রদ্ধা। “ছেলের হাতের আগুন” এই কথার মধ্যে তাঁর জীবনের একান্ত বাসনা ফুটে উঠেছে। অভাগী দুলে জাতের হওয়ায় তার সৎকারের জন্য কাঠ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। উচ্চবর্ণের লোকেরা তাকে ‘নিচু’ মনে করত, এমনকি মৃত্যুর পরেও তার দেহ স্পর্শ করতে ভয় পেত। জমিদারের গোমস্তা অধর রায় কাঙালীকে গালিগালাজ করে তাড়িয়ে দেয়, দারোয়ান তার বাবাকে চড় মারে এসব জমিদারি ব্যবস্থার অত্যাচারকে চিহ্নিত করে। অভাগী জীবনে দুঃখ পেয়েছে, ছেলেকে খাওয়াতে গিয়ে নিজে না খেয়ে থেকেছে, মৃত্যুর সময় কাঠ কেনার পয়সা ছিল না।

অভাগীর স্বর্গ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন উত্তর

সৃজনশীল প্রশ্নঃ ১। [বোর্ড বইয়ের প্রশ্ন]
এই নিষ্ঠুর অভিযোগে গফুর যেন বাক্রোধ হইয়া গেল। ক্ষণেক পরে ধীরে ধীরে কহিল, কাহন খানেক খড় এবার ভাগে পেয়েছিলাম। কিন্তু গেল সনের বকেয়া বলে কর্তামশায় সব ধরে রাখলেন। কেঁদে কেটে হাতে পায়ে পড়ে বললাম, বাবু মশাই, হাকিম তুমি, তোমার রাজত্ব ছেড়ে আর পালাব কোথায়? আমাকে পণদশেক বিচুলি না হয় দাও। চালে খড় নেই। বাপ বেটিতে থাকি, তাও না হয় তালপাতার গোঁজাগাঁজা দিয়ে এ বর্ষা কাটিয়ে দেব, কিন্তু না খেতে পেয়ে আমার মহেশ যে মরে যাবে।

ক. কাঙালীর বাবার নাম কী?

খ. ‘তোর হাতের আগুন যদি পাই, আমিও সগ্যে যাব’- উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।

গ. উদ্দীপকে ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পের যে সমাজচিত্রের ইঙ্গিত রয়েছে তা ব্যাখ্যা কর।

 ঘ. ‘কাঙালীর সঙ্গে উদ্দীপকের গফুরের সাদৃশ্য থাকলেও কাঙালী সম্পূর্ণরূপে গফুরের প্রতিনিধিত্ব করে না।’- মন্তব্যটির যথার্থতা নিরূপণ কর৷

উত্তরঃ

ক. কাঙালীর বাবার নাম রসিক বাঘ।

খ. ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পে দেখা যায়, অভাগী একজন সংস্কারবিশ্বাসী নারী। একদিন সে দেখে, ঠাকুরদাস মুখুয্যের বউ মারা গেছেন এবং তাকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তার ছেলে নিজে আগুন দিয়ে মায়ের সৎকার করছে। এই দৃশ্য দেখে অভাগীর মনে হয়, এমন মরার মধ্যে সুখ আছে। কারণ, হিন্দুধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, ছেলে যদি আগুন দেয়, তাহলে মৃত ব্যক্তি স্বর্গে যায়। তাই অভাগীর মনেও ইচ্ছে জাগে, তার মৃত্যুর সময় তার ছেলেই যেন আগুন দেয়। তাহলেই সে-ও স্বর্গে যেতে পারবে এমনটাই সে ভাবে।

গ. উদ্দীপকটি আর ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্প—দুটোতেই দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের জীবনচিত্র উঠে এসেছে। আমাদের সমাজে ধনী-গরিবের মধ্যে বড় ফারাক দেখা যায়। শুধু তাই নয়, ধর্ম, বর্ণ, জাতি–এসব দিয়েও মানুষকে ভাগ করা হয়। আগে হিন্দু সমাজে অনেক কড়া নিয়ম ছিল, যেখানে নিচু জাতের মানুষকে ছোট করে দেখা হতো। এসব নিয়ম তখন সমাজে স্বাভাবিক মনে করা হলেও, আসলে তা ছিল খুবই অমানবিক। ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পে দেখা যায়, কাঙালী নামের ছেলেটি তার মায়ের সৎকারের জন্য কাঠ চাইতে গিয়ে বহু কষ্ট পেয়েছে, কারণ সে নিচু জাতের। অন্যদিকে উদ্দীপকে বলা গফুর একজন দরিদ্র , যে তার প্রিয় গরু মহেশকে বাঁচানোর জন্য একটু বিচুলি চেয়েও পায়নি। সমাজের বড়লোকরা তাদের সাহায্য করেনি, বরং অবহেলা করেছে। এই দুটো গল্পে দেখা যায়, গরিব আর নিচু জাতের মানুষদের কতটা কষ্টে দিন কাটে, আর সমাজের ক্ষমতাবান লোকেরা তাদের কীভাবে বঞ্চিত করে। এভাবেই দুটি লেখায় শোষিত মানুষের জীবনের মিল পাওয়া যায়।

ঘ. ‘কাঙালীর সঙ্গে গফুরের মিল থাকলেও কাঙালী পুরোপুরি গফুরের প্রতিনিধি নয়’—এই কথাটি একেবারে ঠিক। সব সময়ই সমাজে গরিব মানুষদের ওপর ধনী ও ক্ষমতাবানরা অন্যায় করে এসেছে। শক্তিশালী মানুষরা সব সময় দুর্বলদের দমন করে, আর গরিবরা চুপচাপ সহ্য করে। গফুর একজন গরিব কৃষক। সে জমিদারের জমিতে চাষ করে। আগের বছরের ধান বিক্রির হিসাব দেখিয়ে জমির মালিক তার সব খড় নিয়ে যায়। গফুর অনেক কেঁদে কেটে তার প্রিয় গরু মহেশের জন্য একটু খড় চায়, কিন্তু পায় না। অন্যদিকে ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পে কাঙালী তার মায়ের সৎকারের জন্য কাঠ চায়, কিন্তু কেউ তাকে সাহায্য করে না। বরং তাকে বলা হয়, তার মতো নিচু জাতের লোকের মাকে দাহ করা যায় না। এখানে গফুর ও কাঙালী দুজনই গরিব, আর তাদের দুজনের চাওয়াতেই কষ্ট আছে। তবুও তাদের দুঃখ এক নয়। গফুর তার জীবিত গরুটিকে বাঁচাতে চায়, আর কাঙালী তার মৃত মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে চায়। তাই এই দুজনের যন্ত্রণার রকম আলাদা। এজন্য বলা যায়, মিল থাকলেও কাঙালী পুরোপুরি গফুরের প্রতিনিধি নয়।

সৃজনশীল প্রশ্নঃ ২। [পাবনা ক্যাডেট কলেজ]
কোমলমতি কমলা, স্বামীর সংসারের যে শান্তি তার দেখা হয়নি কখনো। অবহেলায় ও অনাদরে বেড়ে উঠলেও স্বামীর সংসারে সুখ খোঁজার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। অকালে প্রাণ যায় তার। মৃত্যুর পরেও স্বামীর মুখাগ্নি থেকে বঞ্চিত হতে হয় তাকে। স্ত্রী মারা যাওয়ার অল্পদিনের মধ্যেই বিয়ে করে পরাণ। একমাত্র সন্তান প্রতুল সৎমায়ের অনাদর ও নির্যাতনের শিকার হতে থাকে। ফলে প্রতুল অল্পদিনের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।

ক. কাঙালীর মা কোন বংশের মেয়ে?

খ. মুখুয্যে বিস্মিত ও বিরক্ত হয়েছিল কেন?

গ. উদ্দীপকের প্রতুল চরিত্রের সাথে ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পের কাঙালীর সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য তুলে ধর।

ঘ. “উদ্দীপকের কমলা ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পের অভাগীর প্রতিরূপ হয়ে উঠেছে।”- তোমার যুক্তি তুলে ধর।

উত্তরঃ

ক. কাঙালীর মা দুলে বংশের মেয়ে।

খ. কাঙালীর উপস্থিতি ও তার চাওয়ায় মুখুয্যে মহাশয় একদিকে অবাক হন, অন্যদিকে বিরক্তও হন। সমাজে উচ্চ বংশ ও অর্থের জোরে প্রভাবশালী মুখুয্যে মহাশয়ের চোখে নিচু জাতের কাঙালী এবং তার মৃত মা নিতান্তই তুচ্ছ। মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করার জন্য কাঙালী মুখুয্যে বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে অনেক অনুরোধ করছিল। তার কান্নাভরা কথা শুনে মুখুয্যে মহাশয়ের মনে বিরক্তি তৈরি হয়। একই সঙ্গে তিনি বিস্মিতও হন। কারণ, সেই সময় নিচু জাতের মানুষের শবদাহের প্রচলন ছিল না। তার ওপর মুখুয্যে মহাশয় নিজের মৃত স্ত্রীর শ্রাদ্ধের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাই এমন সময়ে কাঙালীর এসে নিজের মায়ের শবদাহের জন্য সাহায্য চাওয়াকে তিনি বিরক্তিকর বলে মনে করেছিলেন।

গ. মাকে হারানো এবং পরে জীবনে নানা কষ্টের মুখোমুখি হওয়ার দিক থেকে উদ্দীপকের প্রতুলের সঙ্গে ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পের কাঙালীর মিল রয়েছে। তবে জীবনের কঠিন অবস্থার প্রভাব ও নৈতিক চরিত্রের বিচারে তাদের মধ্যে পার্থক্যও দেখা যায়।

‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পের কাঙালী মাকে হারিয়ে একেবারে অসহায় হয়ে পড়ে। মায়ের মৃত্যুর পর তাকে একা হাতে অনেক সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়। সে নিচু জাতের বলে সমাজের ক্ষমতাবান মানুষের কাছ থেকে নানা অপমান সহ্য করে। উদ্দীপকের প্রতুলের সঙ্গেও কাঙালীর এই জায়গায় মিল রয়েছে। প্রতুলও অল্প বয়সে মাকে হারায়। মায়ের মৃত্যুর পর তার বাবা আবার বিয়ে করলে তার জীবনে দুঃখ আরও বেড়ে যায়। একসময় সে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। তাই মায়ের মৃত্যু ও পরবর্তী জীবনের নানা খারাপ অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে প্রতুল ও কাঙালীর মধ্যে যথেষ্ট মিল দেখা যায়।

তবে তাদের জীবনের শেষ ফল এক নয়। কাঙালী নানা কষ্ট, অপমান ও সামাজিক অবহেলার শিকার হলেও সে কখনো অন্যায় পথে যায়নি। তার চরিত্রে নৈতিকতার পতন ঘটেনি। সে মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ ধরে রেখেছিল। কিন্তু প্রতুল জীবনের কঠিন পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে অপরাধের পথে চলে যায়। অর্থাৎ প্রতিকূল পরিবেশ কাঙালীকে দুর্বল করলেও তার নৈতিকতা নষ্ট করতে পারেনি, অথচ প্রতুল সেই পরিস্থিতির কাছে হেরে গিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাই মাতৃবিয়োগ ও বিরূপ অভিজ্ঞতার দিক থেকে তাদের মধ্যে সাদৃশ্য থাকলেও পরিণতি ও নৈতিকতার বিচারে তাদের মধ্যে স্পষ্ট বৈসাদৃশ্য রয়েছে।

ঘ. সব দিক বিবেচনা করলে বলা যায়, “উদ্দীপকের কমলা ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পের অভাগীর প্রতিরূপ হয়ে উঠেছে”—কথাটি পুরোপুরি নয়, বরং আংশিকভাবে সত্য। ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পে সমাজের জাতভেদ প্রথার নিষ্ঠুর রূপ ফুটে উঠেছে।

মুখুয্যে বাড়ির গিন্নির সৎকার দেখে অভাগীর মনেও একইভাবে সৎকার পাওয়ার ইচ্ছা জাগে। কিন্তু নিচু জাতের মানুষ হওয়ায় তার সেই ইচ্ছা পূরণ হওয়ার তেমন কোনো সুযোগ ছিল না। অভাগী ছিল স্বামী-পরিত্যক্তা। একমাত্র ছেলে কাঙালীকে নিয়ে তার অভাবের সংসার। জীবনের শেষ সময়ে তার একটাই ছোট ইচ্ছা ছিল মৃত্যুর পর স্বামীর পায়ের ধুলো এবং ছেলের হাতে আগুন নিয়ে যেন সে স্বর্গে যেতে পারে। তার স্বামী রসিক শেষ পর্যন্ত তার এই শেষ ইচ্ছা পূরণ করেছিল।

অন্যদিকে উদ্দীপকের কমলার জীবনও ছিল দুঃখে ভরা। স্বামী-সংসার থাকলেও সে সেখানে ভালোবাসা ও শান্তি পায়নি। এমনকি মৃত্যুর সময়ও তার ছোট্ট ইচ্ছাটুকু স্বামী গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি। কমলা ও অভাগী দুজনেই স্বামীর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত এবং সংসারে নানা কষ্ট সহ্য করেছে। কমলার জীবনে স্বামীর অবহেলা ছিল শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। তার কোনো ইচ্ছাকেই স্বামী গুরুত্ব দেয়নি।

অভাগীর জীবনেও স্বামীর ভালোবাসার অভাব ছিল। তবে তার ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। জীবনের শেষ সময়ে রসিক তার পায়ের ধুলো দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল এবং অভাগীর শেষ ইচ্ছার একটি অংশ পূরণ হয়েছিল। তাই কমলা ও অভাগীর জীবনে স্বামী-অবহেলার মিল থাকলেও সব দিক থেকে তাদের জীবন এক নয়। এ কারণে কমলাকে অভাগীর সম্পূর্ণ প্রতিরূপ বলা যায় না।

সৃজনশীল প্রশ্নঃ ৩। [বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়]
গ্রামে যে দুই-তিনটা পুষ্করিণী আছে, তাহা একেবারে শুষ্ক। শিবচরণ বাবুর খিড়কির পুকুরে যা একটু জল আছে তা সাধারণে পায় না। অন্যান্য জলাশয়ের মাঝখানে দু’একটা গর্ত খুঁড়িয়া যা একটু জল সঞ্চিত হয়, তাহাতে যেমন কাড়াকাড়ি তেমন ভিড়। বিশেষত মুসলমান বলিয়া এই ছোটো মেয়েটা তো কাছেই ঘেঁষিতে পারে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়াইয়া বহু অনুনয়-বিনয়ে কেহ দয়া করিয়া যদি তাহার পাত্রে একটু ঢালিয়া দেয় সেইটুকু সে ঘরে আনে।

ক. অভাগী কাদের কথা দিয়ে তার গল্প আরম্ভ করল?

খ. ‘সে আগুন ত আগুন নয়, কাঙালী, সে ত হরি’- অভাগী একথা বলেছিল কেন? ব্যাখ্যা করো।

গ. ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পের কোন দিকটি উদ্দীপকে দৃশ্যমান? ব্যাখ্যা করো।

ঘ. “মিল থাকলেও উদ্দীপকের মুসলমান মেয়েটি পুরোপুরি ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পের কাঙালী নয়”- যথার্থতা মূল্যায়ন করো।

উত্তরঃ

ক. অভাগী রাজপুত্র, কোটালপুত্র আর পক্ষীরাজ ঘোড়ার কথা দিয়ে তার গল্প আরম্ভ করল।

খ. ‘সে আগুন তো আগুন নয়, কাঙালী, সে তো হরি’—অভাগী এই কথাটি বলেছিল ঠাকুরদাস মুখুয্যের স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলের হাতে মুখাগ্নি এবং সেই দৃশ্য দেখে তার মনে স্বর্গে যাওয়ার আশা জাগার প্রসঙ্গে।

‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পে অভাগী ধর্মীয় সংস্কার ও বিশ্বাসে আস্থাশীল একজন নারী। ঠাকুরদাস মুখুয্যের বৃদ্ধা স্ত্রীর মৃত্যুর পর তার শেষকৃত্য দেখতে যায় অভাগী। সেখানে অনেক মানুষের হরিধ্বনির মধ্যে মৃত নারীর ছেলে যখন মায়ের মুখে আগুন দেয়, তখন অভাগীর চোখে পানি চলে আসে। প্রচলিত হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, সে মনে করে মুখুয্যের স্ত্রী নিশ্চয়ই স্বর্গে যাবেন। এই দৃশ্য দেখে অভাগীর নিজের মৃত্যুর কথাও মনে পড়ে। তার মনে আশা জাগে, মৃত্যুর সময় যদি ছেলে কাঙালী তার মুখে আগুন দিতে পারে, তাহলে সেও মুখুয্যের স্ত্রীর মতো স্বর্গে যেতে পারবে। এই বিশ্বাস থেকেই আবেগে ভরা মনে অভাগী কাঙালীকে উদ্দেশ করে প্রশ্নোক্ত কথাটি বলেছিল।

গ. ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পে জাত-পাতের যে নিষ্ঠুর ও অমানবিক চিত্র দেখা যায়, প্রদত্ত উদ্দীপকের ঘটনাতেও তারই প্রকাশ ঘটেছে। উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের পরিচয় ও জাতের কারণে অসহায় মানুষকে অবহেলা ও কষ্টের শিকার হতে হয়েছে। ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পে সমাজের প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান মানুষের নির্মম আচরণ তুলে ধরা হয়েছে।

উদ্দীপকে খরার কারণে গ্রামের মানুষের পানির খুব অভাব দেখা দিয়েছে। অল্প কিছু জলাশয়ে যে সামান্য পানি আছে, তা নেওয়ার জন্য মানুষের মধ্যে ভিড় ও কাড়াকাড়ি চলছে। এই অবস্থায় হিন্দুপ্রধান গ্রামের এক মুসলমান মেয়েকে পানির জন্য অনেকক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সে বারবার অনুরোধ করলেও সহজে কেউ তাকে পানি দিতে চায় না। কারও মনে দয়া হলে তবেই সে সামান্য পানি পায়।

‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পেও জাতের কারণে এমন বৈষম্যের চিত্র রয়েছে। অভাগীর মৃত্যুর পর তার শেষ ইচ্ছা পূরণের জন্য কাঙালীর কাঠের প্রয়োজন হয়। কিন্তু দুলে জাতের হওয়ায় নিজেদের জমির বেলগাছ কাটতেও সে বাধার মুখে পড়ে। জমিদারের দারোয়ান তাকে গাছ কাটতে দেয় না। পরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও প্রয়োজনীয় কাঠ সংগ্রহ করতে তাকে অনেক কষ্ট করতে হয়। এভাবে উভয় ঘটনাতেই জাতের কারণে অসহায় মানুষের প্রতি সমাজের নিষ্ঠুরতা ও অমানবিক আচরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ঘ. কাঙালীর জীবনের কষ্ট ও শেষ পরিণতি বিবেচনা করলে বলা যায়, “মিল থাকলেও উদ্দীপকের মুসলমান মেয়েটি পুরোপুরি ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পের কাঙালী নয়”—মন্তব্যটি যথার্থ। দুজনের জীবনেই বৈষম্যের শিকার হওয়ার মিল রয়েছে। তবে কাঙালীর ওপর নেমে আসা কষ্ট ও বঞ্চনা ছিল আরও বেশি।

‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পে অভাগীর স্বর্গে যাওয়ার ইচ্ছার মধ্যে সমাজের নিচু শ্রেণির মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কষ্ট ফুটে উঠেছে। দরিদ্র ও নিচু জাতের মানুষ তখন নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হতো। লেখক গল্পের মাধ্যমে সেই অবহেলা ও বঞ্চনার চিত্র খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। অভাগীর মতো কাঙালীকেও সমাজের কঠিন নিয়মের কারণে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে।

উদ্দীপকের হিন্দুপ্রধান গ্রামের ছোট মেয়েটি মুসলমান হওয়ার কারণে পানি সংগ্রহ করতে সমস্যায় পড়ে। সে জলাশয়ের কাছে সহজে যেতে পারে না। তাই তাকে অনেকক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় এবং বারবার অনুরোধ করে পানি চাইতে হয়। শেষ পর্যন্ত কারও দয়া হলে সে অল্প পানি সংগ্রহ করতে পারে। ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পেও জাতভেদের কারণে কাঙালীর জীবনে একই ধরনের বঞ্চনা দেখা যায়। সে দুলে জাতের হওয়ায় মায়ের শেষকৃত্য করার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠ সংগ্রহ করতে পারে না।

তবে কাঙালীর কষ্ট শুধু কাঠ না পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মায়ের সৎকারের জন্য সাহায্য চাইতে গিয়ে সে জমিদারের দারোয়ান, নায়েব ও মুখুয্যে মহাশয়ের কাছ থেকে অবহেলা, অপমান ও উপহাস পেয়েছে। অন্যদিকে উদ্দীপকের মেয়েটি ভিন্ন ধর্মের হওয়ার কারণে সমস্যায় পড়লেও শেষ পর্যন্ত কারও সহানুভূতিতে পানি পেয়ে যায়। তাই জাত-পাত ও বৈষম্যের দিক থেকে দুজনের মধ্যে মিল থাকলেও কাঙালীর বঞ্চনা অনেক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। সে কারণে উদ্দীপকের মেয়েটিকে পুরোপুরি কাঙালীর প্রতিরূপ বলা যায় না। তাই প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।


সৃজনশীল প্রশ্নঃ ৪।
গ্রামের স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক সব ছাত্রছাত্রীকে একসঙ্গে বসার আহ্বান জানান। কিন্তু গ্রামের কয়েকজন অভিভাবক তাদের সন্তানদের উচ্চবর্ণের ছাত্রদের সঙ্গে বসতে দিতে অস্বীকৃতি জানান। তারা বলেন, ‘ওরা নিচু জাতের, ওদের সঙ্গে বসলে আমাদের ছেলেমেয়েদের অপবিত্র হবে।’ প্রধান শিক্ষক তখন তাদের বুঝান যে শিক্ষার আলোয় সবার সমান অধিকার, জাতিভেদ কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থান পায় না।

ক. ঠাকুরদাস মুখুয্যে কাদের বাড়িতে গাছ কাটতে নিষেধ করেন?

খ. ‘অভাগী ছেলের প্রতি রাগ করিয়া বলিল, কেন তুই আমাকে না বলে ঘটি বাঁধা দিতে গেলি বাবা?’—উক্তিটি দিয়ে অভাগীর কোন মানসিকতার পরিচয় মেলে?

গ. উদ্দীপকের অভিভাবকদের আচরণ ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পের কোন দিকটিকে ইঙ্গিত করে? ব্যাখ্যা কর।

ঘ. “প্রধান শিক্ষকের মতো মানবিক মনোভাব থাকলে অভাগীর মৃত্যুশয্যার স্বপ্ন অপূর্ণ থাকত না”—উক্তিটির যথার্থতা বিশ্লেষণ কর।
সৃজনশীল প্রশ্নঃ ৫।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একদিন এক গরিব বৃদ্ধা মারা যান। তাঁর ছেলে সৎকারের জন্য কাঠের ব্যবস্থা করতে না পেরে দোকানদারদের কাছে সাহায্য চায়। কিন্তু কেউ সাহায্য করতে রাজি হয় না। তখন এক সমাজকর্মী এসে বলেন, ‘মৃতের জাত-ধর্ম দেখো না, মানবতা দেখো।’ তিনি নিজ উদ্যোগে কাঠ ও অন্যান্য সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দেন।

ক. অভাগী মৃত্যুর সময় কাকে ডেকে আনতে বলে?

খ. ‘ছোটোজাত বলে তখন কিন্তু কেউ ঘেন্না করতে পারবে না’—উক্তিটির প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা কর।

গ. উদ্দীপকের সমাজকর্মীর ভূমিকা ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পের কোন চরিত্রের ঠিক বিপরীত? ব্যাখ্যা কর।

ঘ. ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পে যদি উদ্দীপকের সমাজকর্মী উপস্থিত থাকতেন, তবে কাঙালীর জীবনদৃষ্টি সম্পূর্ণ বদলে যেত—মন্তব্যটির যথার্থতা বিচার কর।
সৃজনশীল প্রশ্নঃ ৬।
এক গ্রামে দরিদ্র বিধবা তার ছেলেকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটায়। সে তার একমাত্র সন্তানকে লেখাপড়া শেখাতে চায়, কিন্তু গ্রামের ধনী ব্যক্তিরা বলে, ‘ওরা তো দলিত, ওদের লেখাপড়া করে কী লাভ?’ এক দিন ওই বিধবা অসুস্থ হয়ে পড়লে তার ছেলে ডাক্তার ডেকে আনে। ডাক্তার বাড়ি এসে বলেন, ‘দুঃখী মানুষকে সাহায্য করাই ডাক্তারের কাজ, জাত দেখে না।’

ক. কাঙালী তার মায়ের জন্য প্রথম কী রাঁধতে চেষ্টা করে?

খ. ‘ভালো তাহাকে অনেকেই বাসিত’—এই উক্তিটি দিয়ে অভাগীর প্রতি সমাজের কী মনোভাব ফুটে ওঠে?

গ. উদ্দীপকের ডাক্তারের আচরণ ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পের কোন চরিত্রের বিপরীত? ব্যাখ্যা কর।

ঘ. ‘উদ্দীপকের ডাক্তার ও কাঙালীর জীবনের ডাক্তার—উভয়ের মধ্যে মানসিকতার পার্থক্যই সমাজের প্রকৃত রূপ তুলে ধরে’—বিশ্লেষণ কর।
সৃজনশীল প্রশ্নঃ ৭।
এক বিখ্যাত ব্যবসায়ী তাঁর মেয়ের বিয়েতে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষকে নিমন্ত্রণ করেন। অনুষ্ঠানে দরিদ্র এক জেলে পরিবার ভুল করে সম্মানীয় আসনে বসে পড়ে। তখন ব্যবসায়ীর স্ত্রী চিৎকার করে তাদের সরিয়ে দিতে বলেন। কিন্তু ব্যবসায়ী তৎক্ষণাৎ তাদের নিজ হাতে তুলে নিয়ে সম্মানজনক স্থানে বসান এবং বলেন, ‘আমার বাড়িতে সবাই সমান।’

ক. অভাগীর ছেলের নাম কী?

খ. ‘তুই নিকে করলে আমি কোথায় থাকতুম?’—কাঙালীর এই উক্তির মাধ্যমে কী বোঝায়?

গ. উদ্দীপকের ব্যবসায়ীর স্ত্রীর আচরণ ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পের কোন চরিত্রের মতো? ব্যাখ্যা কর।

ঘ. ‘উদ্দীপকের ব্যবসায়ী যদি অভাগীর সময়ে থাকতেন, তাহলে অভাগীকে কাঙালী মরতে হতো না’—উক্তিটি বিশ্লেষণ কর।
সৃজনশীল প্রশ্নঃ ৮।
পাড়ার একটি শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার বাবা-মা তাকে ডাক্তারের কাছে না নিয়ে প্রথমে ওঝা ও তাবিজ-কবজের আশ্রয় নেয়। অনেক দিন চিকিৎসা না হওয়ায় শেষে ডাক্তারের কাছে যায়। ডাক্তার বলেন, ‘এসব কুসংস্কারের চেয়ে সময়মতো চিকিৎসা করলে বাঁচানো যেত।’

ক. গ্রামবাসী অভাগীকে কী ধরনের ওষুধের সন্ধান দেয়?

খ. ‘আমি এমনি সেরে যাবো’—অভাগীর এই উক্তি দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে?

গ. উদ্দীপকের ওঝা ও তাবিজনির্ভর চিকিৎসা ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পের কোন দিকটির প্রতিনিধিত্ব করে? ব্যাখ্যা কর।

ঘ. ‘উদ্দীপকের শিশুটি অভাগী নয়, কিন্তু কুসংস্কারের বলি হওয়ার ক্ষেত্রে তারা একই সারিতে’—মন্তব্যটির যথার্থতা বিচার কর।

অভাগীর স্বর্গ সৃজনশীল প্রশ্ন উত্তর পিডিএফ

📄PDF
📖 পড়ুন

আরও পড়ুনঃ নিরীহ বাঙালি সৃজনশীল প্রশ্ন উত্তর – ৯ম ও ১০ম শ্রেণি

আরও পড়ুনঃ বই পড়া প্রবন্ধের সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর

Related Posts

Leave a Comment