‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতায় সুফিয়া কামাল এভাবে বুঝাতে চেয়েছেন যে, জীবনে দুঃখ ও বিষাদের কারণে আনন্দের সৌন্দর্য কিভাবে ম্লান হয়ে যেতে পারে। এই পোস্টে তাহারেই পড়ে মনে কবিতার মূলভাব ও ব্যাখ্যা সহজ ভাষায়- একাদশ দ্বাদশ শ্রেণির বাংলা লিখে দিলাম।
Table of Contents
তাহারেই পড়ে মনে কবিতার মূলভাব
“তাহারেই পড়ে মনে” কবিতায় কবির ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখ প্রকাশিত হয়েছে, বিশেষ করে স্বামী সৈয়দ নেহাল হোসেনের আকস্মিক মৃত্যুর পর কবির অনুভূত শূন্যতা। এই শোকের কারণে কবির মনের মধ্যে এক বিষণ্ণতা সৃষ্টি হয়েছে। বসন্ত এলেও, কবির অন্তরে শীতের করুণ বিদায়ের বেদনা বিরাজমান। এই কবিতায় বসন্ত এসেছে, প্রকৃতি ফুলে-ফলে, গন্ধে ও সৌন্দর্যে ভরে উঠেছে। বাতাবি লেবুর ফুল, আমের মুকুল, দখিনা বাতাস সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন আনন্দে উচ্ছ্বসিত। কবিভক্ত অবাক হয়ে কবিকে প্রশ্ন করে, এমন সুন্দর বসন্ত এলেও তিনি কেন নীরব, কেন কোনো বসন্তবন্দনার গান রচনা করছেন না। কবি উত্তরে জানান, প্রকৃতির এই আনন্দ তাকে স্পর্শ করতে পারছে না। তার মন দূরের দিকে চেয়ে আছে। যে চলে গেছে, তাকে ফিরে পাওয়ার কোনো সংবাদ নেই। বসন্ত এসেছে ঠিকই, কিন্তু যাকে ঘিরে তার গান, আনন্দ ও সৃষ্টিশীলতা ছিল, সে আর নেই। তাই কবির কণ্ঠে গান আসে না। কবিভক্ত আবার প্রশ্ন করে, ফুল তো ফুটেছে, প্রকৃতি তো বসন্তকে বরণ করেছে, তবু কবি কেন এত বিমুখ? তখন কবি জানান, তার মনে এখনো শীতের রিক্ততা ভর করে আছে। তিনি শীতকে কল্পনা করেন ‘মাঘের সন্ন্যাসী’ হিসেবে। যে শূন্য হাতে, কুয়াশার চাদর গায়ে দিয়ে চলে গেছে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে। শেষ পর্যন্ত কবি স্বীকার করেন, বসন্ত এলেও তার মনে বসন্ত নেই। তার মনে পড়ে যায় সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটির কথা। সেই স্মৃতিই তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তাই তিনি কোনোভাবেই বসন্তের আনন্দে নিজেকে ভাসাতে পারছেন না।
তাহারেই পড়ে মনে কবিতার ব্যাখ্যা
“হে কবি, নীরব কেন ফাগুন যে এসেছে ধরায়, বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়?”
কবির এক বন্ধু বা ভক্ত কবিকে সম্বোধন করে বলছেন, “হে কবি, তুমি কেন নিশ্চুপ বসে আছ? দেখো তো, ফাগুন মাস এসে গেছে পৃথিবীতে! ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করে নেওয়ার জন্য তুমি কি তোমার সাধের বসন্তবন্দনা গানটি গাইবে না? তুমি তো প্রতি বছর এ সময় বসন্তকে নিয়ে গান লিখো, এবার কেন লিখছ না?”
“কহিল সে স্নিগ্ধ আঁখি তুলি – ‘দক্ষিণ দুয়ার গেছে খুলি?'”
কবি মৃদু, কোমল দৃষ্টিতে (স্নিগ্ধ আঁখি) তাকিয়ে বললেন, “দক্ষিণের দরজা কি খুলেছে?”
‘দক্ষিণ দুয়ার’ হলো বাতাসের দিক নির্দেশক। বাংলায় বলা হয় “দক্ষিণা বাতাস” – বসন্তে যে কোমল হাওয়া বয়। কবি জানতে চাইলেন, বসন্তের সেই আলোড়নকারী হাওয়া কি বইতে শুরু করেছে? এই প্রশ্ন থেকেই বোঝা যায়, কবি বসন্তের আগমন টেরই পাননি, তিনি গভীরভাবে নিজের ভাবনায় ডুবে আছেন।
“বাতাবি নেবুর ফুল ফুটেছে কি? ফুটেছে কি আমের মুকুল?”
কবি আবারও জানতে চাইলেন, “বাতাবি নেবুর ফুল কি ফুটেছে? আম গাছের মুকুল (কচি ফুল) কি ফুটেছে?”
বাতাবি লেবু ও আমের মুকুল বসন্তের খুব পরিচিত ও জনপ্রিয় চিহ্ন। কিন্তু কবির এই প্রশ্নই প্রমাণ করে তিনি প্রকৃতির এই পরিবর্তন লক্ষ্য করেননি। তিনি যেন নিজের দুঃখের জগতে এতটাই বন্দি যে বাইরের সুখের খবর তাঁকে স্পর্শ করছে না।
“দখিনা সমীর তার গন্ধে গন্ধে হয়েছে কি অধীর আকুল?”
“দক্ষিণা বাতাস কি সেই সব ফুলের গন্ধে পাগলপ্রায়, আকুল হয়ে উঠেছে?”
বসন্তে ফুলের সুবাসে দক্ষিণা বাতাস মাতোয়ারা হয়ে ওঠে – এ কথা সবার জানা। কিন্তু কবি যেন স্বাভাবিক এই আনন্দ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন।
“এখনো দেখনি তুমি?” কহিলাম, “কেন কবি আজ এমন উন্মনা তুমি? কোথা তব নব পুষ্পসাজ?”
কবির বন্ধু অবাক হয়ে বললেন, “তুমি এখনো এসব দেখনি? হে কবি, আজ তুমি এমন উন্মনা (বিক্ষিপ্তচিত্ত, অস্থির) কেন? তোমার নতুন ফুলের সাজ (পুষ্পসাজ) কোথায়?”
প্রতি বছর বসন্তে কবি নিজেও ফুল দিয়ে সাজতেন, কিন্তু এবার তিনি সেটাও করছেন না। বন্ধুটি কবির এই অস্বাভাবিক উদাসীনতা লক্ষ করে বিস্মিত ও চিন্তিত।
“কহিল সে সুদূরে চাহিয়া – ‘অলখের পাথার বাহিয়া তরী তার এসেছে কি?'”
কবি সুদূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে (চাহিয়া) বললেন, “অদৃশ্য (অলখ) সমুদ্র (পাথার) পাড়ি দিয়ে সেই তরী কি এসেছে?”
এখানে ‘অলখের পাথার’ বা অদৃশ্য সমুদ্র হলো জীবন বা সময়ের গভীরতা। ‘তরী তার’ – এই ‘তার’ কার? এটা কবির প্রিয়জন, যাঁর জন্য তিনি অপেক্ষা করছেন।
“বেজেছে কি আগমনী গান? ডেকেছে কি সে আমারে? শুনি নাই, রাখি নি সন্ধান।”
“সে তরীর আগমনী গান কি বাজছে? সে কি আমাকে ডেকেছে? আমি কিছু শুনিনি, তার কোনো খোঁজও রাখিনি।”
কবি বলছেন, তিনি সেই কাঙ্ক্ষিত সুখের সংকেত পাচ্ছেন না, ডাক শুনতে পাচ্ছেন না। তিনি এতটাই হতাশ ও নিষ্ক্রিয় যে সন্ধানও রাখছেন না। এখানে কবির এক গভীর মানসিক অবসাদ প্রকাশ পেয়েছে।
“কহিলাম, ‘ওগো কবি! রচিয়া লহ না আজও গীতি, বসন্ত-বন্দনা তব কণ্ঠে শুনি – এ মোর মিনতি।'”
কবির বন্ধু অনুনয় করে বললেন, “ওগো কবি! আজও একটি গান রচনা করো না, তোমার কণ্ঠে বসন্তের বন্দনা শুনতে চাই – এ আমার বিনীত অনুরোধ।” বন্ধুটি ভাবছেন, হয়তো গান লিখলে বা গাইলে কবির মন খুলে যাবে, তিনি বসন্তের আনন্দে মিশে যাবেন।
“কহিল সে মৃদু মধু-স্বরে – ‘নাই হলো, না হোক এবারে।'”
কবি মিষ্টি কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে (মৃদু মধু-স্বরে) বললেন, “না হলো, না হোক এবারের বসন্ত।”
এটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান। কবি বুঝিয়ে দিলেন, এবার তিনি বসন্তবন্দনা গাইবেন না।
“‘আমারে গাহিতে গান, বসন্তেরে আনিতে বরিয়া – রহেনি, সে ভুলেনি তো, এসেছে তা ফাগুনে স্মরিয়া।'”
কবি বললেন, “আমার গান গাইতে, বসন্তকে আহ্বান করতেই বসন্তের তো দেরি নেই। সে তো ভোলেনি, ফাগুন মাস মনে পড়তেই সে নিজে থেকেই চলে আসে।”
এখানে কবি বলতে চান, বসন্তের আগমনে আমার গানের কোনো দরকার নেই। বসন্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আসে। এ কথার মধ্যে লুকিয়ে আছে এক ধরনের বিরক্তি বা নিরাসক্তি – “বসন্ত আসবে-ই, আমি গাইলেও আসবে, না গাইলেও আসবে।”
“কহিলাম: ‘ওগো কবি, অভিমান করেছ কি তাই? যদিও এসেছে তবু তুমি তারে করিলে বৃথাই।'”
বন্ধুটি এবার ধরে নিলেন কবি অভিমান করছেন। তিনি বললেন, “ওগো কবি, তুমি কি অভিমান করেছ? বসন্ত এসেছে, কিন্তু তুমি তাকে উপেক্ষা করে তার আগমনকে বৃথা (অর্থহীন) করে দিচ্ছ।”
বন্ধুর ধারণা, বসন্ত যেহেতু কবির গানের জন্য আসে না, তাই কবি হয়তো অভিমান করে গান গাইছেন না।
“কহিল সে পরম হেলায় – ‘বৃথা কেন? ফাগুন বেলায় ফুল কি ফোটেনি শাখে?'”
কবি অত্যন্ত অবহেলার সাথে (পরম হেলায়) বললেন, “বৃথা কেন? ফাগুনের সময় গাছে কি ফুল ফোটেনি?”
কবি বলছেন, আমার গান না গাইলেও বসন্তের সৌন্দর্য তো কমেনি। ফুল তো ঠিকই ফুটেছে। অর্থাৎ, তাঁর উপস্থিতি-অনুপস্থিতিতে প্রকৃতির কাজ থেমে থাকে না।
“‘পুষ্পারতি লভেনি কি ঋতুর রাজন? মাধবী কুঁড়ির বুকে গন্ধ নাহি? করে নাই অর্ঘ্য বিরচন?'”
কবি যুক্তি দিয়ে বললেন, “ঋতুরাজ বসন্ত কি ফুলের অর্ঘ্য (উপহার) পায়নি? মাধবী ফুলের কুঁড়িতে কি গন্ধ নেই? প্রকৃতি কি বসন্তের জন্য অঞ্জলি (অর্ঘ্য) তৈরি করেনি?”
কবি বলতে চান, বসন্তকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রকৃতি নিজেই যথেষ্ট আয়োজন করেছে। তাঁর গানের বিশেষ প্রয়োজন নেই।
“‘হোক, তবু বসন্তের প্রতি কেন এই তব তীব্র বিমুখতা?’ কহিলাম, ‘উপেক্ষায় ঋতুরাজে কেন কবি দাও তুমি ব্যথা?'”
বন্ধুটি এখন জোর দিয়ে বললেন, “ঠিক আছে, তবুও বসন্তের প্রতি তোমার এত তীব্র বিমুখতা (উপেক্ষা) কেন? হে কবি, তুমি ঋতুরাজ বসন্তকে উপেক্ষা করে তাকে ব্যথা দিচ্ছ কেন?”
বন্ধুটি এখনও ভাবছেন, এটি কবির শুধু এক ধরনের জিদ বা অভিমান।
“কহিল সে কাছে সরে আসি – ‘কুহেলি উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী – গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে রিক্ত হস্তে!'”
এবার কবি বললেন, “কুয়াশার (কুহেলি) চাদর (উত্তরী) পরা মাঘ মাসের সেই সন্ন্যাসী (শীত) ধীরে ধীরে ফুলশূন্য দিগন্তের পথে খালি হাতে (রিক্ত হস্তে) চলে গেছে!”
এখানে ‘মাঘের সন্ন্যাসী’ হলো শীতকালের রূপক। শীতকালকে একজন সন্ন্যাসীর মতো কল্পনা করা হয়েছে, যে কুয়াশার চাদর পরে, প্রকৃতিকে ফুলশূন্য ও নিঃসঙ্গ করে রেখে চলে গেছে। ‘রিক্ত হস্তে’ মানে খালি হাতে, কিছু নেই – এটি শীতের শূন্যতা ও কবির বিষাদের প্রতীক।
“‘তাহারেই পড়ে মনে, ভুলিতে পারি না কোনো মতে।'”
কবি বললেন, “সেই শীতের সন্ন্যাসীকেই আমার মনে পড়ে, কোনোভাবেই তাকে ভুলতে পারি না।”
এটি কবিতার শেষ ও সবচেয়ে মর্মস্পর্শী লাইন। কবির মনের গোপন কথা প্রকাশ পেল। বসন্তের প্রাণচাঞ্চল্য নয়, শীতের শূন্যতা, বিষাদ ও বিদায়ই তাঁর হৃদয়ে গভীর দাগ কেটেছে। মানে তাঁর সাহিত্য সাধনার প্রধান সহায়ক ও উৎসাহদাতা স্বামী সৈয়দ নেহাল হোসেনের আকস্মিক মৃত্যুতে (১৯৩২) কবির জীবনে প্রচণ্ড শূন্যতা নেমে আসে।
আরও পড়ুনঃ তাহারেই পড়ে মনে কবিতার MCQ | বহুনির্বাচনি প্রশ্ন উত্তর