১৯৭১ উপন্যাসের মূলভাব ও বর্ণনামূলক প্রশ্ন উত্তর (পিডিএফ সহ)

বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস ‘১৯৭১’ একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে এ উপন্যাসের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। এই পোস্টে ১৯৭১ উপন্যাসের মূলভাব ও বর্ণনামূলক প্রশ্ন উত্তর (পিডিএফ সহ) লিখে দিলাম।

১৯৭১ উপন্যাসের মূলভাব

নীলগঞ্জ নামে একটি ছোট গ্রাম। এই গ্রামের বাসিন্দা মীর আলি এক বৃদ্ধ মানুষ। তিনি চোখে দেখতে পান না, কিন্তু শব্দ খুব ভালো শুনতে পান। তাঁর ছেলে বদিউজ্জামান, পুত্রবধূ অনুফা ও এক নাতনিকে নিয়ে ছোট সংসার। বৃদ্ধ বয়সে মীর আলির সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো রাত-দুপুরে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাইরে যেতে হয়। এজন্য তাকে ছেলে বা পুত্রবধূর সাহায্য নিতে হয়। এতে তিনি ছেলে ও পুত্রবধূর বিরক্তির কারণ হন। এক রাতে প্রস্রাব করতে বাইরে গিয়ে তিনি অদ্ভুত শব্দ শোনেন। ছেলেকে জানালেও ছেলে পাত্তা দেয় না। কিছুক্ষণ পর পঞ্চাশজন সেনার একটি দল গ্রামে ঢোকে। একজন সেনা মীর আলির চোখে টর্চের আলো ফেলে, কিন্তু মীর আলি কিছুই বুঝতে পারেন না। কুকুরের ডাক শুনে তিনি টের পান কেউ যাচ্ছে। পরদিন সবাই জানে মিলিটারি এসে স্কুলঘর দখল করে বসেছে। গ্রামের মসজিদের ইমাম প্রথম বুঝতে পারেন মিলিটারি এসেছে। তিনি খুব ভয় পেয়ে যান। সংক্ষিপ্ত নামাজ পড়ে বেরিয়ে স্কুলের কাছে গেলে মেজর তাঁকে ডেকে নিয়ে যান এবং নির্যাতন করেন। প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আজিজ মাস্টার হাঁপানির রোগী। মেজর তাকেও ডেকে এনে জঙ্গলা মাঠের মুক্তিযোদ্ধাদের কথা জিজ্ঞেস করেন। অথচ আজিজ মাস্টার আগে পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগান দিয়েছিলেন সেনাদের খুশি করতে। কিন্তু সেটা ব্যর্থ হয়। গ্রামের সব মানুষ ভয়ে জড়সড় হয়ে যায়। বদিউজ্জামান জঙ্গলা মাঠে লুকিয়ে থাকে। সেখানে গিরগিটি, শেয়াল, পচা পানির দুর্গন্ধ সহ্য করে। কৈবর্ত মনাকে আগের খুনের দায়ে তার এগারো বছরের ভাইসহ প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। মেজর এজাজ নিষ্ঠুরতার নমুনা দেখাতে চান। তিনি বলেন, মানুষকে ভয় দেখাতে আলাদা আনন্দ আছে। তবুও উপন্যাসে প্রতিবাদ আছে। মনা গুলি খাওয়ার সময় ভয় পায়নি। আজিজ মাস্টার উলঙ্গ হয়ে মরতেও রাজি আছেন বলে জানান। রফিক মেজরের সহকারী, কিন্তু মনেপ্রাণে বাঙালি। তিনি মেজরের সঙ্গে তর্ক করেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেন। শেষ পর্যন্ত দেশপ্রেমের অপরাধে মেজর এজাজ রফিককে গুলি করার আদেশ দেন। রফিক বিন্দুমাত্র ভয় পায় না। বরং তাঁর সাহস দেখে মেজর এজাজের কপালে ঘাম জমতে থাকে।

উপন্যাস ১৯৭১ এর মূলভাব বড় করে

নীলগঞ্জ নামে একটা ছোট গ্রাম। সেখানে মীর আলি নামে এক বৃদ্ধ থাকেন। উপন্যাসের শুরুটা তাঁর যন্ত্রণাময় জীবনের বর্ণনা দিয়ে লেখক করেছেন। মীর আলি বুড়ো, আর চোখেও দেখেন না। কিন্তু চারপাশের সব শব্দ তিনি খুব ভালো শুনতে পান। তাঁর ছেলে বদিউজ্জামান, পুত্রবধূ অনুফা ও এক নাতনিকে নিয়ে ছোট সংসার। বুড়ো বয়সে মীর আলির সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো প্রকৃতির ডাকে রাত-দুপুরে বারবার বাইরে যেতে হয়। তখন ছেলে বা পুত্রবধূর সাহায্য লাগে। এতে ছেলে ও অনুফা বিরক্ত হয়।

এক রাতে প্রস্রাব করতে বাইরে গিয়ে মীর আলি অদ্ভুত শব্দ শোনে। ছেলেকে বললে ছেলে পাত্তা দেয় না। কিছুক্ষণ পর পঞ্চাশজন সেনার একটি দল গ্রামে ঢোকে। একজন মীর আলির চোখে টর্চের আলো ফেলে। মীর আলি কিছু বোঝে না, শুধু কুকুরের ডাক শুনে টের পায় কেউ যাচ্ছে। ছেলে বদি তাকে চুপ করতে বলে। পরদিন সবাই জানে মিলিটারি এসে স্কুলঘর দখল করে বসেছে।

গ্রামের কথা বলি। নান্দাইল রোড স্টেশন থেকে দশ মাইল উত্তরে বুয়াইল বাজার। বর্ষায় হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। আরও ত্রিশ মাইল উত্তরে মধুবন বাজার। শীতকালে গরুর গাড়ি চলে, বর্ষায় হাঁটতে হয়। পূর্ব দিকে সাত মাইল গেলে জঙ্গলা মাঠ, তার পেছনেই নীলগঞ্জ। ত্রিশ-চল্লিশ ঘরের দরিদ্র গ্রাম। জলাভূমির ধারে কৈবর্তরা থাকে, গ্রামের সঙ্গে তাদের তেমন যোগ নেই।

চিত্রা বুড়ির ছেলেকে কৈবর্তপাড়ার মনা খুন করে। বিচার চাইতে গেলে নীলগঞ্জের মাতব্বররা সাহস পায় না। ফলে চিত্রা বুড়ি বিচার না পেয়ে নীলু সেনের কালীমন্দিরের চাতালে থাকে। রাতে দেবীর কাছে খুনের বিচার চায়। মিলিটারি দেখলেও চিনতে পারে না, শুধু আশ্চর্য হয়।

গ্রামে মিলিটারি ঢুকেছে এটা প্রথম বুঝতে পারেন মসজিদের ইমাম। তিনি ভয় পেয়ে যান। কিছু মুসল্লি এলে খুব সংক্ষিপ্ত নামাজ পড়ে বের হন। স্কুলের কাছে মেজর তাঁকে ডেকে নিয়ে যান এবং তথ্য জানতে নির্যাতন চালান।

গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আজিজ মাস্টার। তিনি হাঁপানির রোগী। মেজর এজাজের নির্দেশে দপ্তরি রাসমোহনসহ তাকেও ডেকে আনা হয়। আজিজ মাস্টার প্রথমে বিশ্বাস না করলেও সত্যি জানতে পারেন। মেজর জঙ্গলা মাঠের মুক্তিযোদ্ধাদের কথা জিজ্ঞেস করে। পরে তাঁকেও ইমামের সঙ্গে আটকে রাখেন। অথচ আজিজ মাস্টার পাকিস্তানি মিলিটারির সুদৃষ্টি পেতে পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগান দিয়েছিল, কিন্তু সেটা ব্যর্থ হয়।

মিলিটারি আসার পর সবাই ভীত। মতি মিয়া, জয়নাল মিয়া, রাসমোহন, বদিউজ্জামান সবাই ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে চায়। বদিউজ্জামান মধুবন বাজারের পথ থেকে ফিরে জঙ্গলা মাঠে লুকিয়ে থাকে। সেখানে গিরগিটি, শেয়াল, পচা পানির দুর্গন্ধ সহ্য করে সাহসী হয়। কিন্তু এই সাহস মিলিটারির বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে পারে না। কৈবর্ত মনাকে আগের খুনের দায়ে এগারো বছরের ভাইসহ প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। মেজর এজাজ নিষ্ঠুরতার নমুনা দেখাতে চান। তিনি বলেন, মানুষকে ভয় দেখাতে আলাদা আনন্দ আছে।

উপন্যাসে অন্যায়ের প্রতিবাদও আছে। মনা গুলি খাওয়ার সময় ভয় পায় না, ভাইকে শক্ত করে ধরতে বলে। আজিজ মাস্টারকে উলঙ্গ করে ঘোরাতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মেজর সাহেব, আমি মরতে প্রস্তুত।’ সফদরউল্লাহ শেষ পর্যন্ত স্ত্রী ও শ্যালিকার অপমানের প্রতিশোধ নিতে সুবেদার ও রাজাকারের খোঁজে মাঠে নামে। রফিক মেজরের সহকারী, কিন্তু মনেপ্রাণে বাঙালি। মেজর প্রশ্ন করে নিজাম পাগল বুঝলি কীভাবে? রফিক উত্তর দেয়, ‘ও মিলিটারি আসায় খুশি হয়েছে।’ মানে মিলিটারি আসলে যে খুশি, সে পাগল। এভাবে রফিক তর্ক করে, প্রতিবাদ করে, মুক্তিযোদ্ধাদের কৌশলে সাহায্য করে।

গল্পটা পাকিস্তানি মেজর ও বাংলাদেশি গ্রামের, কিন্তু এক সূক্ষ্ম পথে তা একজন পাকিস্তানি সৈনিক ও এক বাঙালি যুবক রফিকের গল্প হয়ে ওঠে। রফিক মেজরের নির্দেশ মানলেও মতামত দিতে সীমারেখা টেনে দেয়। শেষ পর্যন্ত রফিক সাহসী বাঙালি হয়ে ওঠে। দেশপ্রেমের অপরাধে মেজর এজাজ তাকে গুলি করার আদেশ দিলে রফিক বিন্দুমাত্র ভয় পায় না। বরং তাঁর সাহস দেখে মেজর এজাজের কপালে ঘাম জমতে থাকে।

১৯৭১ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন

প্রশ্ন ১। সফদরউল্লাহর মানসিক পরিবর্তনের প্রধান কারণ ব্যাখ্যা কর।
খ. ‘১৯৭১’ উপন্যাসে প্রতিফলিত নীলগঞ্জের জনজীবনের পরিচয় দাও।

ক) উত্তরঃ সফদরউল্লাহর মানসিক পরিবর্তনের মূল কারণ ছিল তার প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতা। এই প্রতিশোধের ইচ্ছা তার মধ্যে জাগে এক ভয়ংকর ঘটনার পর। এক ঝড়ের রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একজন সুবাদার ও তিনজন রাজাকার তার অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রী ও বারো বছরের শ্যালিকাকে ধর্ষণ করে। এই নিষ্ঠুর ও লজ্জাজনক ঘটনার ফলে সে ভীষণভাবে আহত ও ক্ষুব্ধ হয়। আগে সে ভীতু স্বভাবের হলেও এই ঘটনার পর তার মনে প্রতিশোধ নেওয়ার আগুন জ্বলে ওঠে। তাই সে সেই অপরাধীদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে দা হাতে বেরিয়ে পড়ে। অর্থাৎ, এই অপমান ও লাঞ্ছনার কারণেই তার মানসিক পরিবর্তন ঘটে।

খ) উত্তরঃ ‘১৯৭১’ উপন্যাসে ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ ময়মনসিংহ অঞ্চলের একটি ছোট গ্রাম নীলগঞ্জকে কেন্দ্র করে গল্পটি উপস্থাপন করেছেন। এই শান্ত ও নিরিবিলি গ্রামে বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা, শিক্ষা ও ধর্মের মানুষ বসবাস করে। ভৌগোলিকভাবে গ্রামটি শহর থেকে অনেক ভেতরে অবস্থিত। ময়মনসিংহ-ভৈরব রেললাইনের একটি স্টেশন হলো নান্দাইল রোড। সেখান থেকে উত্তরে প্রায় দশ মাইল গেলে বুয়াইল বাজার, তারপর আরও প্রায় ত্রিশ মাইল গেলে মধুবন বাজার। মধুবন বাজার থেকে পূর্ব দিকে সাত-আট মাইল জঙ্গল পার হয়ে জঙ্গলা মাঠ, আর সেই মাঠের পেছনেই নীলগঞ্জ গ্রাম। এই গ্রামটি ছোট, দরিদ্র এবং মাত্র ত্রিশ-চল্লিশটি ঘর নিয়ে গড়ে উঠেছে। চারদিকে জলাভূমি থাকায় শীত ছাড়া তেমন চাষাবাদ হয় না। গ্রামের কিছু মানুষ পাখি ধরে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা চালায়। বর্ষার আগে তরমুজ ও বাঙ্গি চাষ করে কিছু আয় করে। বেশিরভাগ ঘর খড়ের হলেও যাদের সামান্য সামর্থ্য আছে তারা টিনের ঘর তৈরি করে।

নীলগঞ্জ গ্রামে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ বাস করে। এখানে যেমন ধনী কিন্তু দুর্বলচেতা নীলু সেন আছে, তেমনি মনিহারি দোকানি বদিউজ্জামানও আছে। অন্য গ্রাম থেকে এসে বসবাস করা ইমাম সাহেব ও স্কুলমাস্টার আজিজও এখানে থাকেন। এছাড়া নিম্নবর্ণের কৈবর্ত শ্রেণির মানুষও এখানে বাস করে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ না করে সবাই খুব সাধারণ জীবনযাপন করে। লেখক খুব সুন্দরভাবে এই গ্রামীণ জীবনের চিত্র তুলে ধরেছেন। গ্রামের মানুষগুলো সহজ-সরল, তারা যুদ্ধ কী তা বোঝে না। পাকিস্তানি সেনারা গ্রামে আসার পরও তারা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারে না যে তারা ক্ষতি করবে বা মানুষ হত্যা করবে। এভাবেই লেখক তার শিল্পকুশলতায় ‘১৯৭১’ উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামের জীবনচিত্র তুলে ধরেছেন।


প্রশ্ন ২। ক. “মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালে অনেকেই এরকম করবে।”- এ উক্তিটি কার? উক্তিটি করার কারণ কী ছিল? বুঝিয়ে লেখ।
খ. রফিক ও মেজরের সম্পর্কের টানাপড়েন কীভাবে কাহিনির গতিপথকে প্রভাবিত করেছে? তাদের মধ্যকার সংঘাতের কারণ ব্যাখ্যা কর।

ক) উত্তরঃ “মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালে অনেকেই এরকম করবে।” — এই কথাটি রফিক বলেছিল। মেজর এজাজ যখন আজিজ মাস্টারকে দুইটি পথের মধ্যে বেছে নিতে বলে একটি মৃত্যু, আরেকটি লজ্জাজনকভাবে বেঁচে থাকা। তখন আজিজ খুব দ্বিধায় পড়ে যায়। এই অবস্থাতেই রফিক এই কথাটি বলে। নীলগঞ্জ গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আজিজ মাস্টারকে অনেক নির্যাতন করার পরও সে কোনো তথ্য দেয় না। তখন মেজর তাকে বলে, হয় তাকে মেরে ফেলা হবে, নয়তো তার পুরুষাঙ্গে ইট বেঁধে গ্রামে ঘোরানো হবে। এতে আজিজ প্রথমে লজ্জাজনকভাবে বেঁচে থাকতে চায়, কিন্তু পরে সে মৃত্যুকেই বেছে নেয়। মেজর মনে করত বাঙালিদের কোনো মান-সম্মান নেই। কিন্তু রফিক মনে করে, মৃত্যুর সামনে দাঁড়ালে অনেক মানুষই এমন সিদ্ধান্ত নেয়। তাই সে এই কথাটি বলে, কারণ সে বাঙালির অপমান মেনে নিতে পারছিল না।

খ) উত্তরঃ ‘১৯৭১’ উপন্যাসে রফিক ও মেজরের মধ্যে মূলত সহযোগিতার সম্পর্ক দেখা যায়। নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারি আসার দিন থেকেই জানা যায়, মেজর এজাজের সঙ্গে নীল শার্ট পরা এক রহস্যময় যুবক আছে, তার নাম রফিক। শুরু থেকেই লেখক রফিককে একটু রহস্যময়ভাবে তুলে ধরেছেন। সে আসলে কোন পক্ষের, তা সহজে বোঝা যায় না। গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বললে মনে হয় সে পাকিস্তানি বাহিনীর লোক, আবার মেজরের সঙ্গে থাকলে তার কিছু আচরণে মনে হয় সে বাঙালিদের পক্ষের। এজন্য মেজরও তাকে মাঝে মাঝে সন্দেহ করে। লেখক ইচ্ছে করেই রফিককে এমনভাবে দেখিয়েছেন, যাতে তাকে পুরোপুরি বোঝা না যায়। তবে উপন্যাসের শেষ দিকে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। রফিক আসলে একজন দেশপ্রেমিক বাঙালি, যে নিজের জীবন দিয়ে সত্যটা প্রমাণ করে।

রফিক ও মেজরের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব দেখা যায়, তা মূলত মূল্যবোধের পার্থক্যের কারণে। মূল্যবোধ মানুষকে ভালো-মন্দ বোঝায়। মেজর এজাজ যখন নীলগঞ্জ গ্রামের সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করে, তখন রফিক সবকিছু কাছ থেকে দেখে। পাকিস্তানি সেনারা ধর্মের নামে দেশ গড়ার কথা বললেও আসলে তারা মানুষের ওপর নিষ্ঠুর আচরণ করছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এই দেশের দখল নেওয়া। তাই তারা হিন্দু-মুসলিম কাউকেই রেহাই দেয়নি। এই অন্যায় ও অত্যাচার একজন বিবেকবান মানুষের পক্ষে চুপ করে দেখা সম্ভব নয়। রফিকের মধ্যেও এই মানবিক বোধ ছিল। আর এই কারণেই মেজরের সঙ্গে তার সংঘাত বাড়তে থাকে।


প্রশ্ন ৩। ক. আজিজ মাস্টারের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল? ব্যাখ্যা কর।
খ. রফিক চরিত্রটি তোমার কাছে কি দ্বিমুখী চরিত্র মনে হয়? তোমার উত্তরের পক্ষে কারণ দেখাও।

ক) উত্তরঃ আজিজ মাস্টারের শেষ পরিণতি ছিল খুবই মর্মান্তিক মৃত্যু। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ দেশের অনেক বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছিল। স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। আজিজ মাস্টার একজন বুদ্ধিমান মানুষ হলেও স্বভাবে কিছুটা ভীতু ছিলেন। নীলগঞ্জ গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে মিলিটারিরা ঘাঁটি করার প্রথম দিনেই তাকে ডেকে নেয়। এরপর তাকে এবং ইমাম সাহেবকে স্কুলের টিচার্স রুমে আটকে রেখে নানা ধরনের নির্যাতন করা হয়। কারণ সেনারা মনে করত, মাস্টার মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে। তাই তাকে শাস্তি দিতে প্রথমে কাপড় খুলে অপমান করা হয়, পরে তাকে গ্রামে ঘুরিয়ে দেখানোর কথাও বলা হয়। কিন্তু এই অপমান সহ্য করার চেয়ে মৃত্যু বেছে নেওয়াই ভালো মনে করে আজিজ মাস্টার মেজরকে অনুরোধ করেন, যেন তাকে বিলের ধারে গুলি করে মারা হয়। শেষ পর্যন্ত তাই ঘটে। তিনি অপমানের বদলে মৃত্যুকেই বেছে নেন।

খ) উত্তরঃ না, রফিক চরিত্রটি আমার কাছে দ্বিমুখী মনে হয় না।

‘১৯৭১’ উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র রফিক। সে পাকিস্তানি অফিসার এজাজের সহযোগী হিসেবে নীলগঞ্জ গ্রামে আসে এবং দোভাষীর কাজ করে। শুরু থেকেই রফিককে রহস্যময় মনে হয়। বাইরে থেকে সে পাকিস্তানিদের সঙ্গে থাকলেও বাঙালিদের প্রতি তার সহানুভূতি ছিল। যেমন কালীমূতির আড়ালে লুকানো বলাইকে দেখে ফেলেও মেজরের চোখ এড়িয়ে যেতে সাহায্য করা, কৈবর্ত পাড়ায় তল্লাশি না করতে দেওয়া, আজিজ মাস্টারকে অপমানজনক শাস্তি থেকে বাঁচাতে চাওয়া—এসব তার মানবিকতার প্রমাণ।

রফিক চরিত্রটি বিশেষ হয়ে উঠেছে তার চুপচাপ স্বভাবের কারণে। সে খোলাখুলি কিছু বলে না, তাই তাকে জটিল মনে হয়। অনেক সময় তাকে বাস্তবের চেয়ে প্রতীকী চরিত্র বলেই মনে হয়। সে নীলগঞ্জে আগে না এলেও গ্রামের পথঘাট ও মানুষের সঙ্গে পরিচিত ছিল। ইমাম সাহেব তার পরিচয় জানতে চাইলে সে উত্তর না দিয়ে উল্টো ধমক দেয়। এতে বোঝা যায়, সে ধর্মীয় গোঁড়ামি পছন্দ করত না এবং অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের ছিল। মেজর এজাজও তার এই মনোভাব বুঝে তাকে ‘সত্তর ভাগ হিন্দু’ বলে ব্যঙ্গ করে।

রফিক বাইরে থেকে মেজরের সহযোগী হলেও ভেতরে সে ছিল দেশের মানুষের পক্ষের একজন প্রতিনিধি। উপন্যাসের শেষে তার কথাবার্তায় বোঝা যায়, সে পুরোপুরি পাকিস্তানবিরোধী। এই বিষয়টি বুঝতে পেরে মেজর তাকে হত্যা করতে চায়। তখন চারদিকে আগুন জ্বলছিল, আর রফিক মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে বিলে নেমে যায়। আগুনের আলোয় তার মুখে এক ধরনের দৃঢ়তা দেখা যায়, যা দেখে মেজরের মনে হয়—এ যেন অন্য এক রফিক। তাই বলা যায়, রফিক কোনো দ্বিমুখী চরিত্র নয়, বরং একজন প্রতিবাদী ও দেশপ্রেমিক বাঙালি যুবক।

নিচের পিডিএফ ফাইলে ১৯৭১ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন ও উত্তর আরও বেশি দেওয়া আছে।

১৯৭১ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন উত্তর পিডিএফ

Related Posts

Leave a Comment