আমার বাড়ি কবিতার মূলভাব, ব্যাখ্যা ও বহুনির্বাচনী প্রশ্ন উত্তর

“আমার বাড়ি” কবিতাটি পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের একটি জনপ্রিয় কবিতা, যা তার পল্লীজীবন এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ণনা করে। এখানে আমার বাড়ি কবিতার মূলভাব, ব্যাখ্যা ও বহুনির্বাচনী প্রশ্ন উত্তর দেয়া হল।

আমার বাড়ি কবিতার মূলভাব

জসীমউদ্দীনের ‘আমার বাড়ি’ কবিতায় কবি এক প্রিয় মানুষকে নিজের বাড়িতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তিনি অতিথিকে সম্মান করে পিঁড়েতে বসতে দেবেন এবং মন থেকে আপ্যায়ন করবেন। শালি ধানের চিঁড়ে, বিন্নি ধানের খই, কবরী কলা ও গামছা-বাঁধা দই দিয়ে আপ্যায়ন করবেন। এসব খাবার শুধু খাওয়ার জিনিস নয়, বরং ভালোবাসা ও আন্তরিকতার প্রকাশ। কবি অতিথিকে প্রকৃতির মাঝেই আনন্দ দিতে চান। আম ও কাঁঠালের বাগানের পাশে শুয়ে বিশ্রাম নেওয়ার কথা বলেছেন। গাছের ডাল নড়ে যে বাতাস বইবে, তা অতিথির মনকে শান্ত করবে। চাঁদ ও তারার আলো যেন অতিথিকে আনন্দ দেবে। সকালে গরু দোহনের শব্দে ঘুম ভাঙবে। এটি গ্রামজীবনের পরিচিত দৃশ্য। কবি সারাদিন অতিথিকে নিয়ে আনন্দে সময় কাটাতে চান। ডালিম গাছ, ডালিম ফুল আর কাজল দিঘিতে ভাসমান হাঁস গ্রামের সৌন্দর্য দেখাবেন। কবিতার শেষে কবি আবারও অনুরোধ করেন, ভোমর (বন্ধু) যেন সেই চেনা পথ ধরে তার বাড়িতে আসে।

আমার বাড়ি কবিতার ব্যাখ্যা

আমার বাড়ি যাইও ভোমর,
বসতে দেব পিঁড়ে,

কবি তাঁর প্রিয়জনকে “ভোমর” বা মৌমাছি বলে ডাকছেন। এই ডাকটি অত্যন্ত স্নেহময়। মৌমাছি যেমন ফুলের মধু খুঁজে বেড়ায়, তেমনি কবির বাড়িও এমন এক মধুর জায়গা, যেখানে প্রিয়জন এসে শান্তি ও স্নেহের “মধু” পাবেন। “পিঁড়ে” হল কাঠের তৈরি ছোট্ট বসার আসন, যা গ্রামবাংলার সাধারণ ঘরোয়া আসবাব। কবি বলছেন, “তুমি এসো, আমি তোমার জন্য বিশেষভাবে বসার জায়গাটি তৈরি করে রেখেছি, যাতে তুমি আরামে বসতে পারো।”

জলপান যে করতে দেব
শালি ধানের চিঁড়ে।

“জলপান” মানে হালকা নাস্তা বা আপ্যায়ন। “শালি ধান” এক বিশেষ প্রকারের উৎকৃষ্ট ধান, যা থেকে তৈরি চিঁড়ে খুবই সুস্বাদু হয়। কবি শুধু সাধারণ চিঁড়ে দেবেন না, দেবেন সেরা জাতের ধানের চিঁড়ে। এর মধ্যে আছে গ্রাম্য আতিথেয়তার এক ঐতিহ্যবাহী রীতি মেহমানকে বাড়ির সেরা জিনিসটি উপহার দেওয়া।

শালি ধানের চিঁড়ে দেব,
বিন্নি ধানের খই,

শুধু চিঁড়েই নয়, তিনি বাড়তি হিসেবে দেবেন “বিন্নি ধানের খই”। বিন্নি ধানও একটি সুঘ্রাণযুক্ত ও সুস্বাদু ধানের প্রকার। “খই” (ধানভাজা) গ্রামবাংলার খুবই জনপ্রিয় খাবার। এখানে কবি বলছেন, “তোমাকে শুধু এক ধরনের জিনিস দিয়ে ক্ষান্ত হব না, বরং আমি আমার সব ধরনের উৎকৃষ্ট খাবার দিয়ে তোমাকে খুশি করতে চাই।”

বাড়ির গাছের কবরী কলা,
গামছা-বাঁধা দই।

“কবরী কলা” একটি বিশেষ প্রকারের মিষ্টি ও নরম কলা, যা বাড়ির গাছেই ফলে। এটা শুধু কলা নয়, বাড়ির টুকরো স্নেহ। আর “গামছা-বাঁধা দই” বলতে বোঝায় এত ঘন ও স্বাদু দই যে তা একটি গামছার কাপড়ে বাঁধা থাকে। গ্রামে দই তৈরি করার পর এভাবেই ঝুলিয়ে রাখা হয়। কবি মেহমানকে বলছেন, বাড়ির গাছের ফল এবং বাড়িতে তৈরি অতি উৎকৃষ্ট দই খাওয়াবে।”

আম-কাঁঠালের বনের ধারে
শুয়ো আঁচল পাতি,

এখন কবি খাওয়া-দাওয়ার পর বিশ্রামের ব্যবস্থার কথা বলছেন। “আম-কাঁঠালের বন” হলো প্রকৃতির এক শান্ত নীড়। তিনি প্রিয়জনকে বলছেন, সেই সবুজ, ছায়াঘেরা বনের ধারে তিনি নিজের “আঁচল” (শাড়ি বা কাপড়ের প্রান্ত) পেতে দেবেন, যাতে মেহমান আরামে শুতে পারেন।

গাছের শাখা দুলিয়ে বাতাস
করব সারা রাতি।

এটি কবিতার একটি মায়াবী লাইন। তিনি যেন প্রকৃতিকে আদেশ দিচ্ছেন, “হে গাছেরা, তোমাদের ডালগুলো দোলাও, যাতে বাতাস তৈরি হয়, আর সেই বাতাস সারারাত ধরে আমার প্রিয় অতিথির গায়ে বয়ে যায়, তাকে শান্তিতে ঘুম পাড়ায়।” এখানে প্রকৃতি কবির বন্ধুর সেবায় নিয়োজিত।

চাঁদমুখে তোর চাঁদের চুমো
মাখিয়ে দেব সুখে,

“চাঁদমুখ” বলতে অতিথির অত্যন্ত সুন্দর ও জ্যোৎস্নাময় চেহারা বোঝানো হয়েছে। কবি বলছেন, আকাশের চাঁদের আলো যখন সেই সুন্দর মুখে পড়বে, সেটি যেন এক প্রকৃতির চুম্বন। কবি সেই চুম্বনের অনুভূতি (সুখ) অতিথির মুখে “মাখিয়ে দেবেন”, অর্থাৎ, তিনি তাকে এমন এক পরিবেশে রাখবেন যেখানে প্রকৃতিই তাকে ভালোবাসা ও প্রশান্তি দেবে।

তারা ফুলের মালা গাঁথি,
জড়িয়ে দেব বুকে।

“তারা ফুল” হচ্ছে ছোট ছোট সাদা সুগন্ধী ফুল, যা দিয়ে মালা গাঁথা হয়। কবি নিজ হাতে সে মালা গাঁথবেন এবং সেটি অতিথির বুকে বা গলায় জড়িয়ে দেবেন। এটি শুধু একটি ফুলের মালা নয়, এটি স্বাগত, সম্মান ও ভালোবাসার প্রতীক। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে ফুলের মালা অতিথিকে দেওয়ার প্রচলন রয়েছে।

গাই দোহনের শব্দ শুনি
জেগো সকাল বেলা,

এখানে কবি বিশ্রামের পর সকালের বর্ণনা দিচ্ছেন। শহুরে এলার্মের বদলে গ্রামে সকাল শুরু হয় প্রাকৃতিক শব্দে। গরুর দুধ দোহনের শব্দে। কবি বলছেন, “তুমি চিন্তামুক্ত থাকো, তোমাকে জোর করে ঘুম থেকে তুলব না। তুমি তখনই জেগে উঠবে, যখন গরুর দুধ দোহনের শান্ত, ছন্দময় শব্দ তোমার কানে আসবে।”

সারাটা দিন তোমায় লয়ে
করব আমি খেলা।

এটি কবির সরল ও শিশুসুলভ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। তিনি শুধু আনুষ্ঠানিক আপ্যায়ন করেই থেমে যাবেন না, বরং সারাদিন ধরে তিনি তার অতিথিকে নিয়ে “খেলা” করবেন। এখানে “খেলা” মানে হাসি-তামাশা, গল্প করা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে বেরানো অর্থাৎ, নিঃসংকোচে, বন্ধুর মতো আনন্দে সময় কাটানো।

আমার বাড়ি ডালিম গাছে
ডালিম ফুলের হাসি,

কবি তার বাড়ির চারপাশের সৌন্দর্যের বর্ণনা দিচ্ছেন। ডালিম গাছে ফুল ফুটলে সেটি দেখতে খুব সুন্দর লাগে। “ফুলের হাসি” একটি সৌন্দর্যময় রূপক। এর মানে, কবির বাড়ি শুধু একটি ঘর নয়, তার চারপাশের প্রকৃতির প্রতিটি অংশই প্রাণবন্ত, সুন্দর ও হাস্যময় যেন সেগুলোও অতিথিকে স্বাগত জানাচ্ছে।

কাজলা দিঘির কাজল জলে
হাঁসগুলি যায় ভাসি।

“কাজলা দিঘি” হলো কাজলের মতো কালো জলের দিঘি। সেই কালো জলে সাদা হাঁসগুলোর ভেসে বেড়ানো এক অতুলনীয় দৃশ্য তৈরি করে। কবি বলছেন, তার বাড়ির কাছে এমন একটি শান্তিপূর্ণ ও চিত্ররূপময় দৃশ্য আছে, যা দেখলে মন শান্ত হয়ে যায়।

আমার বাড়ি যাইও ভোমর,
এই বরাবর পথ,

কবি আবারও প্রিয়জনকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। তিনি যেন পথ ভুলে না যান, তার জন্য সহজ নির্দেশনা দিচ্ছেন। “এই বরাবর পথ” মানে সরাসরি, সহজ পথ। তিনি বলছেন, “তোমাকে জটিল পথে আসতে হবে না। খুব সহজ সরল পথে আমার বাড়ি চলে আসো।”

মৌরি ফুলের গন্ধ শুঁকে
থামিও তব রথ।

কবি কল্পনা করছেন, তার প্রিয়জন হয়তো রথে (বাহনে) চড়ে আসছেন। বাড়ির পথে “মৌরি ফুলের” এমন মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে থাকবে যে, সেই গন্ধ শুঁকেই তার রথ নিজেই থেমে যাবে। অর্থাৎ, প্রকৃতির সৌন্দর্য ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশ এতটাই প্রবল যে, তা যেকোনো যাত্রীকে আকৃষ্ট করবেই এবং তার গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই থামিয়ে দেবে।

আমার বাড়ি কবিতার বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (MCQ)

১। জসীমউদ্‌দীন কী নামে পরিচিত?
(ক) নাগরিক কবি
(খ) পল্লিকবি
(গ) গ্রামীণ কবি
(ঘ) আধুনিক কবি
উত্তর: (খ) পল্লিকবি

২। ‘আমার বাড়ি’ কবিতাটি জসীমউদ্দীনের কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত?
(ক) রাখালি
(খ) দুই পয়সার বাশি
(গ) সোজন বাদিয়ার ঘাট
(ঘ) হাসু
উত্তর: (গ) সোজন বাদিয়ার ঘাট

৩। ‘আমার বাড়ি’ কবিতাটির রচয়িতা কে?
(ক) শামসুর রাহমান
(খ) সুকুমার রায়
(গ) হাসু
(ঘ) জসীমউদ্দীন
উত্তর: (ঘ) জসীমউদ্দীন

৪। কবি বন্ধুকে কোথায় বসতে দেবেন?
(ক) চেয়ারে
(খ) খাটে
(গ) পিঁড়িতে
(ঘ) জলচৌকিতে
উত্তর: (গ) পিঁড়িতে

৫। কবি বন্ধুকে জলপান করাতে কোন ধানের চিড়ে দেবেন?
(ক) বিনি
(খ) শালি
(গ) বাসমতি
(ঘ) ইরি
উত্তর: (খ) শালি

৬। কবি বন্ধুকে বাড়ির গাছের কবরি কলার সাথে আর কী দেবেন?
(ক) আতপ ভাত
(খ) পোলাও
(গ) গামছা বাঁধা দই
(ঘ) মিষ্টি
উত্তর: (গ) গামছা বাঁধা দই

৭। কবি তাঁর বন্ধুকে কোন বনের ধারে শুইতে দেবেন?
(ক) হিজল
(খ) আম-কাঁঠাল
(গ) তমাল
(ঘ) ডালিম
উত্তর: (খ) আম-কাঁঠাল

৮। কবি তাঁর বন্ধুকে কীভাবে সারারাত বাতাস করবেন?
(ক) হাত পাখা নিয়ে
(খ) তাল পাতার পাখা দিয়ে
(গ) গাছের শাখা দুলিয়ে
(ঘ) গামছা দিয়ে
উত্তর: (গ) গাছের শাখা দুলিয়ে

৯। ‘আমার বাড়ি’ কবিতা মতে গাই দোহনের শব্দের সঙ্গে কোন সময়টি প্রযোজ্য?
(ক) সকালবেলা
(খ) দুপুরবেলা
(গ) বিকালবেলা
(ঘ) সন্ধ্যাবেলা
উত্তর: (ক) সকালবেলা

১০। কবি তাঁর বন্ধুকে নিয়ে সারাদিন কীভাবে কাটিয়ে দিবেন?
(ক) গ্রামের প্রকৃতি দেখে দেখে
(খ) খেলা করে
(গ) বিভিন্ন খাবার পেয়ে
(ঘ) পুকুর পাড়ে বসে বসে
উত্তর: (খ) খেলা করে

১১। কাজল কালো দিঘিতে কী ভেসে বেড়ায়?
(ক) কচুরিপানা
(খ) শ্যাওলা
(গ) হাঁস
(ঘ) পানকৌড়ি
উত্তর: (গ) হাঁস

১২। কবির বাড়িতে যাওয়ার জন্য পথটি কেমন?
(ক) আঁকাবাঁকা
(খ) বরাবর সোজা
(গ) উঁচুনিচু
(ঘ) ফেঞ্চালনয়
উত্তর: (গ) উঁচুনিচু

১৩। কবি তাঁর বন্ধুকে কোন ফুলের গন্ধ পেয়ে গাড়ি থামাতে বলেছেন?
(ক) ডালিম
(খ) কদম
(গ) মৌরি
(ঘ) হিজল
উত্তর: (গ) মৌরি

১৪। কাঠের তৈরি ছোটো ও নিচু আসনকে বলে—
(ক) চৌকি
(খ) মোড়া
(গ) পিঁড়ে
(ঘ) খাট
উত্তর: (গ) পিঁড়ে

১৫। নিচের কোনটি ‘ভোমর’ শব্দের প্রতিশব্দ?
(ক) ভ্রমর
(খ) মৌমাছি
(গ) রেশম পোকা
(ঘ) ভিমরুল
উত্তর: (ক) ভ্রমর

১৬। ‘বিন্নি’ কী?
(ক) এক প্রকার খই
(খ) এক প্রকার চাল
(গ) এক প্রকার ধান
(ঘ) জলপান করা
উত্তর: (গ) এক প্রকার ধান

১৭। ‘জলপান’কে কী বলা হয়?
(ক) হালকা নাশতা
(খ) জলকে পান
(গ) জলের খাবার
(ঘ) রেশম পোকা
উত্তর: (ক) হালকা নাশতা

আরও পড়ুনঃ বাঁচতে দাও কবিতার মূলভাব, প্রশ্ন ও বহুনির্বাচনি – ৬ষ্ঠ শ্রেণির বাংলা

Related Posts

5 thoughts on “আমার বাড়ি কবিতার মূলভাব, ব্যাখ্যা ও বহুনির্বাচনী প্রশ্ন উত্তর”

Leave a Comment