কালিদাস রায়ের ‘বাবুরের মহত্ত্ব’ কবিতাটি একটি ঐতিহাসিক ও নৈতিক গল্পের মাধ্যমে মুঘল সম্রাট বাবুরের মহানুভবতা ও ন্যায়পরায়ণতার চিত্র তুলে ধরে। এই পোস্টে বাবুরের মহত্ত্ব কবিতার অনুধাবন প্রশ্ন ও উত্তর লিখে দিলাম।
বাবুরের মহত্ত্ব কবিতার অনুধাবন প্রশ্ন
১। সম্রাট বাবুর কীভাবে শত্রুর হৃদয় জয় করেছিলেন?
উত্তরঃ সম্রাট বাবুর শত্রুর হৃদয় জয় করেছিলেন তার মহানুভবতা, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিকতার মাধ্যমে। তিনি শুধু যুদ্ধজয়ীই ছিলেন না, বরং প্রজাদের দুঃখ-কষ্ট বুঝতে তাদের মধ্যে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতেন। একটি শিশুকে হাতির পা থেকে বাঁচানোর সময় তার সাহস ও নিঃস্বার্থতা দেখে চিতোরের এক যুবক তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়। বাবুরের ন্যায়বোধ ও ক্ষমাশীলতা দেখে যুবকটি তার প্রতিহিংসা ত্যাগ করে এবং বাবুরের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। এইভাবে বাবুর শত্রুর হৃদয় জয় করেছিলেন।
২। ‘মাটির জয় খাঁটি জয় নয়’- উক্তিটি দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তরঃ এই উক্তিটি দিয়ে বোঝানো হয়েছে যে শুধু ভূমি বা রাজ্য জয় করাই প্রকৃত জয় নয়। প্রকৃত জয় হলো মানুষের হৃদয় জয় করা। বাবুর বুঝেছিলেন যে শাসন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু যুদ্ধজয়ই যথেষ্ট নয়, বরং প্রজাদের ভালোবাসা ও বিশ্বাস অর্জন করা জরুরি। তাই তিনি প্রজাদের হৃদয় জয় করার চেষ্টা করেছিলেন।
৩। রাজপুত যোদ্ধা বাবুরের নিকট আত্মসমর্পণ করেন কেন?
উত্তরঃ রাজপুত যোদ্ধা বাবুরের নিকট আত্মসমর্পণ করেন কারণ বাবুরের মহানুভবতা ও ন্যায়পরায়ণতা দেখে তার মন পরিবর্তন হয়। বাবুর একটি শিশুকে হাতির পা থেকে বাঁচানোর সময় তার সাহস ও মানবিকতা দেখে যুবকটি বুঝতে পারে যে বাবুর প্রকৃতপক্ষে ভারতের যোগ্য শাসক। তাই সে তার প্রতিহিংসা ত্যাগ করে বাবুরের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।
৪। “পাঠান-বাদশা লোদি পানিপথে হত।”- বুঝিয়ে লেখ।
উত্তরঃ এই লাইনটি পানিপথের প্রথম যুদ্ধের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। এই যুদ্ধে মুঘল সম্রাট বাবুর পাঠান শাসক ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত ও নিহত করেন। এই যুদ্ধের মাধ্যমে বাবুর দিল্লির সিংহাসন দখল করেন এবং উত্তর ভারতের নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন। এটি ছিল বাবুরের ভারত বিজয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
৫। বাবুর প্রজারঞ্জনে মন দিয়েছিলেন কেন?
উত্তরঃ বাবুর প্রজারঞ্জনে মন দিয়েছিলেন কারণ তিনি বুঝেছিলেন যে শুধু যুদ্ধজয় ও ভূমি দখল করাই যথেষ্ট নয়। প্রকৃত শাসন টিকিয়ে রাখতে হলে প্রজাদের ভালোবাসা ও বিশ্বাস অর্জন করা জরুরি। তাই তিনি প্রজাদের দুঃখ-কষ্ট বুঝতে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতেন এবং তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতেন।
৬। ‘দেখিল বাবুর এ-জয় তাঁহার ফাঁকি’- চরণটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তরঃ এই চরণটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে বাবুর তার বিজয়কে অসম্পূর্ণ মনে করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন যে শুধু যুদ্ধজয়ই যথেষ্ট নয়, কারণ ভারতের বিভিন্ন অংশ তখনও তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। তাই তিনি মনে করেছিলেন যে তার বিজয় এখনও সম্পূর্ণ হয়নি এবং তাকে আরও সংগ্রাম করতে হবে।
৭। “সারা উত্তর ভারত আসিল বিজয়ীর করতলে।”- বলতে কী বোঝ?
উত্তরঃ এই লাইনটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে পানিপথ ও খানুয়ার যুদ্ধে বিজয়ের পর সম্রাট বাবুর উত্তর ভারতের বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন। তার সামরিক কৌশল ও বীরত্বের মাধ্যমে তিনি উত্তর ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও অঞ্চল নিজের অধীনে আনেন।
৮। “কুর্তার তলে কৃপাণ লুকায়ে ঘুরিছে সে পথে পথে।”- কেন?
উত্তরঃ চিতোরের রাজপুত যোদ্ধা বাবুরের প্রাণ নেওয়ার জন্য ছদ্মবেশে ঘুরছিল। সে বাবুরের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা নেওয়ার জন্য কুর্তার (জামা) নিচে ছুরি লুকিয়ে রেখেছিল এবং বাবুরের সন্ধানে পথে পথে ঘুরছিল। কিন্তু বাবুরের মহানুভবতা ও মানবিকতা দেখে তার মন পরিবর্তন হয় এবং সে তার প্রতিহিংসা ত্যাগ করে।
৯। “শোণিতে তাহার ক্ষালিত করিবে চিতোরের অপমান।”-কথাটির মধ্য দিয়ে কী প্রকাশ পেয়েছে?- ব্যাখ্যা কর।
উত্তরঃ এই কথাটির মাধ্যমে রাজপুত যোদ্ধার প্রতিহিংসাপরায়ণ মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। সে চিতোরের অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বাবুরের প্রাণ নিতে চায়। তার ধারণা ছিল যে বাবুরের রক্তে চিতোরের অপমান ধুয়ে ফেলা যাবে। এই লাইনে যোদ্ধার আবেগ, গর্ব ও প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে।
১০। রাজপুত যোদ্ধা বাবুরের নিকট আত্মসমর্পণ করেন কেন?
উত্তরঃ রাজপুত যোদ্ধা বাবুরের নিকট আত্মসমর্পণ করেন কারণ বাবুরের মহানুভবতা ও ন্যায়পরায়ণতা দেখে তার মন পরিবর্তন হয়। বাবুর একটি শিশুকে হাতির পা থেকে বাঁচানোর সময় তার সাহস ও মানবিকতা দেখে যুবকটি বুঝতে পারে যে বাবুর প্রকৃতপক্ষে ভারতের যোগ্য শাসক। তাই সে তার প্রতিহিংসা ত্যাগ করে বাবুরের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।
১১। “প্রাণ-রক্ষকই হইলে আমার, প্রাণের ঘাতক নও।”- এ পঙ্ক্তিটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তরঃ এই পঙ্ক্তিটি দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে রাজপুত যোদ্ধা বাবুরের প্রাণ নেওয়ার জন্য এসেছিল, কিন্তু বাবুরের মহানুভবতা দেখে সে তার জীবন বাঁচানোর কাজে নিয়োজিত হয়। বাবুর তাকে বলেছেন যে সে এখন তার প্রাণের ঘাতক নয়, বরং তার প্রাণরক্ষক। এই কথার মাধ্যমে বাবুরের ক্ষমা ও মানবিকতার দিকটি ফুটে উঠেছে।
১২। ‘পথ ছাড়ি সবে পলাইয়া গেল’- কেন?
উত্তরঃ ‘পথ ছাড়ি সবে পলাইয়া গেল’ এই ঘটনাটি ঘটেছিল যখন একটি মত্ত হাতি পথে ছুটে আসে। হাতির ভয়ে সবাই পথ ছেড়ে পালিয়ে যায়, কারণ তারা হাতির আক্রমণ থেকে বাঁচতে চেয়েছিল। এই দৃশ্যটি হাতির ভয়াবহতা এবং মানুষের আতঙ্ককে প্রকাশ করে। শুধুমাত্র একটি শিশু এবং বাবুর সাহস দেখিয়ে সেই বিপদে এগিয়ে আসেন।
১৩। ‘মাটির দখলই খাঁটি জয় নয়’- চরণটি বুঝিয়ে লেখ।
উত্তরঃ এই চরণটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে শুধু ভূমি বা রাজ্য জয় করাই প্রকৃত জয় নয়। প্রকৃত জয় হলো মানুষের হৃদয় জয় করা। বাবুর বুঝেছিলেন যে শাসন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু যুদ্ধজয়ই যথেষ্ট নয়, বরং প্রজাদের ভালোবাসা ও বিশ্বাস অর্জন করা জরুরি। তাই তিনি প্রজাদের হৃদয় জয় করার চেষ্টা করেছিলেন।
১৪। ‘কৃতঘ্ন দৌলত’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তরঃ ‘কৃতঘ্ন দৌলত’ বলতে বিশ্বাসঘাতক দৌলত খাঁ লোদি-কে বোঝানো হয়েছে। দৌলত খাঁ লোদি ছিলেন পাঞ্জাবের শাসক এবং ইব্রাহিম লোদির আত্মীয়। তিনি প্রথমে ইব্রাহিম লোদির বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করে মুঘল সম্রাট বাবুরকে ভারত আক্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানান। পরে তিনি বাবুরের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করেন।
১৫। ‘ফেলে দিয়ে ওরে এখন করগে স্নান’- উক্তিটি কেন করা হয়েছে?
উত্তরঃ এই উক্তিটি করা হয়েছে কারণ শিশুটিকে বাঁচানোর পর এক ব্যক্তি বিদেশি পুরুষকে বলেছিল যে শিশুটি মেথরের ছেলে, অর্থাৎ নিম্নবর্ণের। তাই তার মতে, শিশুটির জন্য প্রাণ ঝুঁকানো অর্থহীন। সে বিদেশি পুরুষকে শিশুটিকে ফেলে দিয়ে স্নান করে শুদ্ধ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। এই উক্তিতে সমাজের বর্ণভেদ ও শ্রেণিবৈষম্যের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়।
১৬। রণবীর চৌহানের প্রতিহিংসার অন্ধ মোহের ঘোর কেটে যায়। কেন? ব্যাখ্যা কর।
উত্তরঃ রণবীর চৌহানের প্রতিহিংসার অন্ধ মোহের ঘোর কেটে যায় কারণ বাবুরের মহানুভবতা ও ন্যায়পরায়ণতা দেখে তার মন পরিবর্তন হয়। বাবুর একটি শিশুকে হাতির পা থেকে বাঁচানোর সময় তার সাহস ও মানবিকতা দেখে চৌহান বুঝতে পারে যে বাবুর প্রকৃতপক্ষে ভারতের যোগ্য শাসক। তাই তিনি তার প্রতিহিংসা ত্যাগ করে বাবুরের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।